গল্প

ছোটগল্প: স্বপ্নছায়া

স্বপ্নছায়া

গল্পকার- শাহাদত হোসেন সুজন

তখনো সূর্য ওঠেনি। চারদিক আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। ঘন কুয়াশায় প্রকৃতি যেন সাদা চাদর মুড়ে বসে আছে। ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতে জনজীবন জড়সড়ো। এরপরও থেমে থাকেনি মানুষের নিত্য দিনের কাজকর্ম। আক্কাস তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে এই ভোরে চলছে মাঠে। মাঠে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি হচ্ছে মিয়া বাড়ির সামচু কাকার ঘরের পিছন দিয়ে। আক্কাসের পথ চলার শব্দে সামচু কাকা বললেন-কে যায় রে?
-কাকা আমি, আক্কাএত ভোরে কোথায় যাস?
-মাঠে কাকা।
-মাঠে আগে নামিস না। আমি আসি।
-জ্বী কাকা।


আক্কাস এ সময় ক্ষেতে পড়ে থাকা ধান আর ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে যে ধান পায় তাই দিয়ে স্ত্রী ও তিন ছেলে দুই মেয়ের সংসার কোন মতে চালিয়ে নেয়। এতে কোন বেলা পেট পুড়ে খেতে পায়, কোন বেলা অর্ধপেটা আবার কোন বেলা অনাহরে দিনাতিপাত হয় তাদের।
আক্কাস উঁচু বংশে জন্ম নিলেও আজকাল অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। সমাজে মান নিয়ে চলাতো দূরের কথা মান বাঁচিয়ে চলাই কষ্টকর। কি আর করা যায় বেঁচে থাকতে হবে তো! ছেলে মেয়েদেরকে মানুষ করতে হবে। তাদের সংসার গড়িয়ে দিতে হবে। এসব নানা ভাবনায় দিন কেটে যায়।
আক্কাস কথা মতো সামচু কাকার জমিতে আর নামল না। পাশের জমিতে অন্যদের সঙ্গে নামতে হলো। ভেবেছিল আজ হয়তো এতো প্রত্যুষে কেউ উঠবে না। সেই প্রথম মাঠে যাবে। কিন্তু না, মাঠে গিয়ে দেখল আরও অনেক আগে অনেকেই এসেছে। আক্কাস ওদের দেখে তো অবাক। ওরা এত ভোরে ধান কুড়ায় না আটির শীষ কুড়ায়! কি আর করা সব উপর আল্লার ইচ্ছা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু বলল- উনি মুখ দিয়েছেন আহারও দিবেন।

দুই.
ভালো বীজে ভাল ফসল আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভালো বীজে ভালো ফসল হলেও অনেক সময় তা সময় মতো ঘরে উঠানো সম্ভব হয় না। এর জন্য থাকতে হয় নিয়তির সঙ্গে অদম্য কর্মস্পৃহা। তবেই হয়তো সম্ভব। কিন্তু সব ইচ্ছা শক্তিকে এক করেও হয়তো এ জীবনে সুলতাকে পাওয়া হবে না সুস্ময়ের। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সে বড়। বাবা আক্কাস মিয়া প্রায় হাতের উপরেই সংসারটা চালান। সুস্ময় সবে মাত্র ডিগ্রী পাস করেছে। চাকুরী খুঁজছে। এ যুগে চাকুরী খুঁজলেই তো আর পাওয়া যায় না। চাকুরী এখন সোনার হরিণ। এ দূর্লভ জিনিসটাকে পেতে বিভিন্ন যোগ্যতা লাগে, শুধু মেধা যোগ্যতা থাকলেই হয় না…।
সুলতা গ্রামের চৌধুরী বাড়ির মেয়ে। তিন ভাই বোনে মধ্যে সুলতা মেজ। এবার আই-এ পাশ করেছে। রেজাল্ট ও ভাল জি.পি.এ ৩.৯১। চৌধুরী সাহেবের ইচ্ছা সুলতা গাইবান্ধা সরকারী মহিলা কলেজে ডিগ্রীতে ভর্তি হবে। মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত হবে। চৌধুরী বাড়ির মুখ উজ্জ্বল করবে। তার পর স্বপ্নের এক রাজপুত্রের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিত হবে। এ সব ভাবনার মুখে ছাই দিয়ে সুলতা কখন যে সুস্ময়কে ভালোবাসতে শুরু করেছে সে কথা চৌধুরী সাহেব তো দূরের কথা সে নিজেও জানে না। স্বপ্নগুলো ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। বাড়তে বাড়তে তা প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। সুস্ময় রোজ বিকেলে সুলতার ছোট ভাই স্বপনকে পড়াতে আসে। আজও এসেছে। সুলতা ধীর পায়ে এসে টেবিলে পাশের খাটের কিনারে বসল। সুস্ময় মুখ তুলে চেয়ে মৃদু হেসে বলল- আরে সুলতা যে, কেমন আছো, শরীর ভালো?
-জ্বী ভাল, আপনি ভাল? কথাগুলো যেন অর্ধেক মুখে অর্ধেক মাথা নেড়ে বলল। সুস্ময় ওর ভাষা বুঝতে পারে। তাই তার অস্পষ্ট কথাগুলো বুঝতে সমস্যা হলো না।
-কোথায় ভর্তি হবে শুনি? কি লাভ শুনে?

না মানে… তবুয়ো।

থাক্। শুনতে হবে না। ভর্তি হলে শুনতে পারবেন, জানতেও পারবেন, কথা শেষ হতে না হতেই স্বপন চেচিয়ে উঠল- স্যার আমাদের পড়ার সময় রোজ ও এসে আমাদেরকে ডিস্টার্ব করে কেন?
সুস্ময় কি যেন ভাবছিল-মুহূর্তেই নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে হাসি মুখে বলল- তাই তো। স্বপন তুমিতো একটা ভাল জিনিস খেয়াল করেছো।
স্বপনের কথায় সুস্ময়ের সায় দেয়ায় সুলতা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল- যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। আর কখনো আসব না বলে দ্রæত বেগে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সুস্ময়ের ইচ্ছা সত্বেও পিছু ডাকতে পারল না। তবে ওর চলে যাওয়াতে বুঝতে পারছে হৃদয়ের নিভৃত কোণে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ওর হাতে হাত, চোখে চোখ রেখে ভালোবাসার কথা বলতে পারবে কি না সে জানে না। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওকে নিজের ঘরের বউ করতে পারবে কি না, সব স্বপ্নগুলো সত্যি হবে কি না-
স্বপন ডাক দেয়- স্যার…কিছু ভাবছেন?

না…পড়। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ভাবতে গিয়ে সব গুলিয়ে ফেলছে। আস্তে আস্তে তার সমস্ত প্রকৃতি ঘন আধারে হারিয়ে যাচ্ছে।

তিন.
পাশের গাঁয়ের গফুর ব্যাপারী অনেক দিনের ইচ্ছা চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে বন্ধুত্বটা আরো প্রগাঢ় করার। আজ সেই ইচ্ছা পূরণের সময় এসেছে। তার বড় ছেলে জামান রংপুর মেডিকেল কলেজ হতে ডাক্তারী পাস করে ডাক্তার হয়েছে। চৌধুরী সাহেবের মেয়ে সুলতাও দেখতে শুনতে রূপে গুনে মাশাল্লাহ্ বড়ই চমৎকার। তাই আজ আর এই ইচ্ছা পূরণের কোন সমস্যাই নেই। চৌধুরী সাহেবেরও অমত নেই। চৌধুরী সাহেব চিলেকোঠার বারান্দায় বসে গফুর ব্যাপারীর সঙ্গে খোশ মেজাজে গল্প জমিয়েছেন। পান চিবুতে চিবুতে বললেন-ভাইসাব, বিয়ের পর ও কিন্তু আমার মেয়ে লেখা পড়া করবে।
গফুর ব্যাপারী মহাখুশীতে বললেন- অবশ্যই, অবশ্যই চৌধুরী সাব। এতে আমার কোন দ্বিমত নেই, খরচ আমিই দেব।
-ঠিক আছে ঠিক আছে, পরে তা দেখা যাবে।তা ভাইসাব আগামী চৈত্রের ১৬ তারিখেই বিয়ের তারিখ ঠিক থাকল।

ঠিক আছে। তুমি ছেলেকে ফোন করে দিও।

দেবো মানে, আজ, এক্ষুণি দিচ্ছি। তা আমি এবার উঠি চৌধুরী সাব।

আর চৌধুরী সাব নয়, বেয়াই সাব বল, এই বলে দুই জনে হো হো করে হেসে উঠল।
গফুর ব্যাপারী পান চিবুতে চিবুতে কাঠের ছাতাতে ভর করে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে বের হয়ে গেল। কারণটা চৌধুরী সাহেব না জানলেও গফুর ব্যাপারীর নিকট তা অতি স্পষ্ট। চৌধুরী সাহেব পুরনো ধনী। গফুর ব্যাপারী ধান-পাটের ব্যবসা করে আজ বেশ কিছু টাকার মালিক।
গফুর ব্যাপারী ভাল করেই জানে এ সমন্ধ করতে পারলে ছেলে সুখী না হলেও তিনি বেশ সুখী হবেন।
সুলতা ঘরের ভিতর থেকে সব শুনল। তার হাত পা শীতল হয়ে আসছে। ভর দুপুরে সোনালী রৌদ্রে চারদিক যখন আলোকিত তখন সে ঘোর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। পুকুর পারের তাল গাছগুলোতে বাসা বাঁধা বাবুই পাখির ঘরগুলো যখন মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে তখন তার দম আটকে আসছে। কষ্ট, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। সুলতা এই মুহূর্তে কি করবে বুঝতে পারছে না। মুক্তার দানার মতো অশ্রæ দু’চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ক‚ল কিনারা না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে গড়িয়ে গেল…।
এতদিনের সাজানো স্বপ্ন গুলো দু’চোখের সামনে একে একে সব বায়োস্কোপের মতো ভেসে উঠতে লাগল, সুস্ময়কে ঘিরে যে স্বপ্নগুলো তড়বড় করে তৃণলতায় বেড়ে উঠেছিল। তা আজ এক নিমিষেই ধূলার সঙ্গে মিশে যেতে বসেছে।

চার.
আজ ১৬ চৈত্র। সুলতার বিয়ে। শুধু সুলতার বিয়ে নয়। সুস্ময়েরও ঢাকা যাওয়ার দিন। ওর এলাকার বড় ভাইয়ের সুবাদে ঢাকায় একটা ফার্মে চাকুরী হয়েছে। বেতন খারাপ না, অন্যান্য কিছু সুযোগ সুবিধাও রয়েছে। সুস্ময় বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার পথে পা বাড়ালো।
সুলতাদের বাড়ির সামন দিয়ে এঁকে বেঁকে যাওয়া মেঠ পথটিই গ্রাম থেকে বেড়ানোর একমাত্র পথ। দেড় কিলোমিটার রাস্তা হাঁটলেই মিনি বিশ্বরোড। এখানে সকালে বিকালে ঢাকাগামী মফিজ গাড়িগুলো পাওয়া যায়। সুলতার বাড়ির সামনে এসে পা আর চলছে না। আজ ওকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে সুলতা আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে জীবন মরণে সঙ্গী করতে চাই। আমি আজ আর বেকার নই, সকার হয়েছি। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। যখন বেকার ছিলাম সুলতা তখনই আমার ছিল, আজ যখন সকার হওয়ার প্রত্যয়ে গ্রাম ছাড়ছি, ঠিক তখনি আমাকে ছেড়ে অন্যের ঘরে চলে যাচ্ছে। হায় প্রেম, তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? বাড়ির কাছাকাছি যতই আসছে ততই ঐ বাড়ির সব ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। কিন্তু সুলতা কে তো চোখে পড়ছে না। সুলতার বিয়ে খুব ধুমধাম করে হচ্ছে। বর পক্ষের জন্য নানা রকমের মজাদার খাবার রান্না হচ্ছে। কাঠ পোড়ার ধোঁয়া বাড়ির সবকিছু ছাড়িয়ে ঐ দূর আকশের গায়ে ঠাঁই নিচ্ছে। কাঠ পোড়া ধোঁয়াগুলো সবাই দেখতে পাচ্ছে। সুস্ময়ের কলিজা পোড়ার ধোঁয়াগুলো হয়তো কখনই কেউ দেখবে না। শুধু এর ছাইগুলো সুস্ময়ের হৃদয় কোণে আজীবন থেকে যাবে। স্বপ্নগুলো ছায়া হয়েই থাকবে…

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon
Tags: গল্প

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.