বিজ্ঞান (এসকে)

প্রাথমিক বিজ্ঞান (এসকে); অধ্যায়-২ মাটি

অধ্যায়-০২: পরিবেশের উপাদান ও পরিবেশ সংরক্ষণ

সেশন-২.২: পরিবেশের উপাদান: মাটি

ক্লাসের আলোচ্যবিষয়:

  • মাটি কাকে বলে? মাটির গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করুন।
  • মাটির গঠন উপাদান কয়টি? মাটির গঠন উপাদান বর্ণনা করুন।
  • মাটির প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।

মাটি কাকে বলে? মাটির গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করুন।

মাটি :

মাটি হলো একটি মিশ্রণ। বিভিন্ন খনিজ বা অজৈব পদার্থ, জৈব পদার্থ,পানি ও বায়ুর মিশ্রণই মাটি।  মাটি বলতে সাধারণত পৃথিবীর নরম ভূ- পৃষ্ঠ বা উপরিভাগকে বুঝায়।

মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে ভূ-পৃষ্ঠের যে নরম  উপরিভাগে বা  যে স্তর  গাছপালা জন্মে এবং যেখান থেকে গাছ পুষ্টি শোষণ  করে  বড়  হয়  তাকে  মাটি বলে।

মাটির গঠন প্রক্রিয়াঃ

মাটির বর্তমান অবস্থা লাভ করতে বহু বছর লেগেছে। সূর্য  থেকে  বিচ্ছিন্ন  একটি  উত্তপ্ত গ্যাসপিন্ডরূপে পৃথিবীর সৃষ্টি। এ গ্যাসপিন্ড সূর্যের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমান্বয়ে ঠান্ডা হয় এবং এর উপরিভাগে অনেক বড় বড় শিলার উৎপত্তি হয়। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় তাপ, শৈত্য, তুষারপাত, বৃষ্টি, বন্যা, বায়ুপ্রবাহ, রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে শিলাগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। আরো পরে গাছপালা ও জীবজন্তুর পচা দেহাবশেষ ক্ষুদ্র কণার সাথে মিশে মাটি গঠিত হয়েছে। অতএব, মাটি হচ্ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিলাকণা, জৈবকণা, পানি ও বায়ুর সংমিশ্রণে গঠিত একটি মিশ্রণ। বিভিন্ন স্থানের মাটি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে। তাই বিভিন্ন স্থানের মাটি দেখতে ভিন্ন ভিন্ন, গঠনেও ভিন্ন। তবে মাটির উপরিভাগ থেকে নিচের দিকে অনুসন্ধান করলে সাধারণভাবে কয়েকটি স্তর দেখা যায়।

  • মাটির একদম উপরের স্তরটিতে পচা ও মৃত জীবদেহ মিশে থাকে। পচা ও মৃত জীবদেহ মিশে তৈরি কালো বা অনুজ্জ্বল উপাদানকে হিউমাস বলে। মাটির উপরের দিকে হিউমাস বেশি থাকে। এ হিউমাস থেকে উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পায়।
  • দ্বিতীয় স্তরে হিউমাস কমে আসে, এজন্য মাটি কম কালো বা কিছুটা উজ্জ্বল হয়।
  •  তৃতীয় স্তর মূলত ক্ষুদ্র শিলাকণা দ্বারা গঠিত।
  • সবশেষে নিচের স্তরটি কেবল শিলাখন্ড দ্বারা গঠিত।

বাংলাদেশের নদীর কাছাকাছি স্থানে বন্যা হয়। এসব স্থানের মাটির উপরিভাগ বন্যার পানি দ্বারা বয়ে আনা পলিমাটি দ্বারা গঠিত। এসব স্থানের মাটির উপরের স্তর সেজন্য খুব পুরনো হয় না। এ মাটি ফসল চাষের জন্য খুব উপযোগী।

মাটির গঠন উপাদান কয়টি? মাটির গঠন উপাদান বর্ণনা করুন।

মাটির গঠন উপাদানঃ

সাধারণত পৃথিবীর নরম ভূ-পৃষ্ঠ বা উপরিভাগকে মাটি বলা হয়। মাটি একটি যৌগিক পদার্থ। বিভিন্ন প্রকার জৈব ও অজৈব পদার্থ দিয়ে মাটি গঠিত। যেমন- নুড়ি পাথর, বালু্‌, কাদা, পানি, বায়ু, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহের পচাঁ অংশ মিলে মাটি তৈরি হয়। অর্থাৎ মাটি হচ্ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিলাকণা, জৈবকণা,পানি ও বায়ুর সংমিশ্রণে গঠিত একটি মিশ্রণ। মাটির গঠন উপাদান মূলত চারটি।  এ চারটি উপাদান মাটিতে বিভিন্ন পরিমাণে থাকে। এর উপাদানগুলো মধ্যে থাকে:

১. শতকরা ৪৫ ভাগ খনিজ বা অজৈব পদার্থ,

 ২. শতকরা ৫ ভাগ জৈব পদার্থ,

৩. শতকরা ২৫ ভাগ পানি ও

৪. শতকরা ২৫ ভাগ  বায়ু।   

এছাড়া  ব্যাকটেরিয়াও মাটির অন্যতম উপাদান।

১। খনিজ বা অজৈব পদার্থ: 

মাটির খনিজ পদার্থের উৎস ভূ-পৃষ্ঠের আদি শিলা। সূর্যের  তাপ, বৃষ্টিপাত,বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে আদি শিলা ক্ষয় হয়ে খনিজ পদার্থে পরিণত হয়। মাটিতে খনিজ পদার্থের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। বালিকণা,কাদার কণা,পলিকণা ইত্যাদি খনিজ পদার্থ। খনিজ পদার্থ নানাভাবে মিশে মাটির বুনট সৃষ্টি করে।

২। জৈব পদার্থ:  

জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। মৃত গাছপালা, জীবজন্তু মাটিতে মিশে জৈব পদার্থ সৃষ্টি হয়। একে হিউমাসও বলে। জৈব পদার্থ মাটিকে উর্বর করে। যে মাটিতে জৈব পদার্থের উপাদান যত বেশি সে মাটি তত উর্বর। জৈব পদার্থ মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। জৈব পদার্থের অণুজীব ক্রিয়াশীল হয়,ফলে কার্বন,নাইট্রোজেন,ফসফরাস,সালফার,ক্যালসিয়াম ইত্যাদি উদ্ভিদের গ্রহণ উপযোগী হয়।

৩। পানি: 

পানি মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে পানি জমা থাকে। পানি উদ্ভিদের খাদ্য উপাদানকে দ্রবীভূত করে গ্রহণ উপযোগী করে। পানি মাটিকে রসালো রাখে। মাটিতে পানি থাকে বলেই বীজ অঙ্কুরিত হয়। বৃষ্টি ও সেচের পানিই মাটির পানির প্রধান উৎস।

৪। বায়ু: 

বায়ু মাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে বায়ু থাকে। বীজের অঙ্কুরোদ্গম ও মূলের শ্বাসপ্রশ্বাসে বায়ুর প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন অণুজীবের বংশবিস্তারেও বায়ু দরকার হয়। জমি চাষ দিলে মাটিতে বায়ুর পরিমাণ বাড়ে।

মাটির প্রকারভেদ বর্ণনা করুন।

মাটির প্রকারভেদ:

মাটিতে অজৈব অংশের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অজৈব অংশে বালিকণা, সূক্ষ্মকণা,পলিকণা মিলেমিশে মাটির বুনট তৈরি করে। মাটির বুনটের ওপর ভিত্তি করেই মাটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা-বেলে মাটি, দো-আঁশ মাটি ও এঁটেল মাটি।

বেলে মাটি: 

এ ধরনের মাটিতে বালিকণার পরিমাণ সবচেয়ে  বেশি থাকে। এ  মাটির কণাগুলো আকৃতিতে বড় বলে মাটিতে যথেষ্ট ফাঁক থাকে এবং অনায়াসে পানি ও বায়ু প্রবেশ করতে পারে। এ মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কম এবং মাটি উপরের স্তরে অনুর্বর। সমুদ্র উপকূল,চর এলাকা ও মরুভূমিতে এ মাটি দেখা যায়। তরমুজ, শসা, ফুটি, চীনাবাদাম, গোল আলু ও মিষ্টি আলু ইত্যাদি এ ধরনের মাটিতে ভালো জন্মে।

দো-আঁশ মাটি: 

এ ধরনের মাটিতে বালি, পলি ও কর্দম কণা প্রায় সমান পরিমাণে থাকে। দো-আঁশ মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি। এ মাটির পানি শোষণ ও ধারণ ক্ষমতা দুই-ই বেশি। দো- আঁশ  মাটি কৃষিকাজের  জন্য  বেশি  উপযোগী। বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের মাটিই দো-আঁশ মাটি। কৃষিক্ষেত্রে দো-আঁশ মাটিকে আদর্শ মাটি বলা হয়। দো-আঁশ মাটিকে আবার বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন- বেলে দো-আঁশ, পলি দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ। নিচে বিভিন্ন ধরনের দো- আঁশ মাটির পরিচয় দেওয়া হলো।

ক) বেলে দো-আঁশ: 

এ ধরনের দো-আঁশ মাটিতে বালিকণার পরিমাণ বেশি এবং পলি ও কর্দম মিশ্রিত থাকে। এ মাটি ঝরঝরে প্রকৃতির এবং শস্য জন্মানোর খুবই উপযোগী। তিস্তার অববাহিকায় এ মাটির আধিক্য লক্ষ করা যায়। মুলা, তামাক, মরিচ ও কচু এ মাটিতে ভালো জন্মে।

খ) পলি দো-আঁশ: 

এ ধরনের দো-আঁশ মাটিতে পলিকণার পরিমাণ বেশি এবং জৈব ও খনিজ লবণ সমৃদ্ধ থাকে। এ মাটি অত্যন্ত উর্বর ও সব ধরনের ফসলের উপযোগী। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে পলি দো-আঁশ মাটি দেখা যায়। ধান, পাট, আখ, নানাবিধ সবজি এ মাটিতে ভালো জন্মে।

গ) এঁটেল দো-আঁশ: 

এ ধরনের দো-আঁশ মাটিতে কর্দম কণার পরিমাণ বেশি থাকে। পানি ও জৈব ধারণ ক্ষমতা বেশি। বেশি বৃষ্টিপাত ও অনাবৃষ্টি ছাড়া সহজে চাষ উপযোগী। গঙ্গার অববাহিকা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ধান, তুলা, গম, ডাল, তেল ফসল ভালো জন্মে।

এঁটেল মাটি: 

এ ধরনের মাটিতে কর্দম কণার পরিমাণ বেশি থাকে । এঁটেল মাটিকে ভারী মাটি বলা হয়। এ মাটিতে বালিকণার চেয়ে পলিকণার পরিমাণ বেশি থাকে। পানি ধারণ ক্ষমতা বেশী কিন্তু নিষ্কাশন ক্ষমতা কম। পানির সংস্পর্শে এঁটেল মাটি নরম হয়  আবার শুকালে খুবই শক্ত হয়। ধান, পাট, আখ ও শাকসবজি এ মাটিতে ভালো জন্মে।

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.