বিষয়: পেশাগত শিক্ষা (২য় খন্ড)

২য় অধ্যায়: শিখন শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

ক্লাস-১৩: শৃঙ্খলা, শৃঙ্খলার প্রকারভেদ, শিশুর ভিন্নতা ও শিশুর ভিন্নতার ধরণ

· শৃঙ্খলা (Discipline) কী?

· শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা কত প্রকার ও কী কী?

· একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিভিন্ন সংস্থায় কী বলা হয়েছে?

· শিশুর ভিন্নতা বলতে কী বুঝায়?

· শিশুদের ভিন্নতার ধরনসমূহ উল্লেখপূর্বক বর্ণনা করুন।

· শিক্ষার্থীদের ভিন্নতা চিহ্নিতকরণ ও চাহিদা নিরূপণের উপায় লিখুন।

শৃঙ্খলা (Discipline) কী?

শৃঙ্খলা হলো এমন কিছু কর্ম যা একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনের ব্যবস্থা বা চুক্তি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। শৃঙ্খলা সাধারণত মানব ও প্রাণী আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োগ করা হয়। শ্রেণি ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শৃ‫ঙ্খলা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেউদ্দেশ্যমুখী আচরণে অভ্যস্ত করে তোলা যায়।

শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা কত প্রকার ও কী কী?

শৃঙ্খলা শ্রেণি ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্ব একটি উপাদান। সাধারণ শিক্ষার্থীদরে আচরণ নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ৩ ধরনের শৃ‫খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, যথা:

১. প্রতিরোধমূলক শৃঙ্খলা,

২. সহায়তামূলক শৃঙ্খলা এবং

৩. সংশোধনমূলক শৃঙ্খলা।

একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিভিন্ন সংস্থায় কী বলা হয়েছে?

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে সকল শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার আছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশ সরকার প্রণীত শিশু অধিকার আইন অনুযায়ী সকল শিশুরই মৌলিক শিক্ষার অধিকার আছে এবং এ উদ্দেশ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির অধিকার আছে। আমাদের শিক্ষানীতিও একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা বলেছে যেখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নির্বিশেষে সকল শিশুরই একই বিদ্যালয়ে এবং একই শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষালাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং বাস্তব কারণেই শ্রেণিকক্ষ বলতে এখন একীভূত শ্রেণিকক্ষই বোঝায়।

শিশুর ভিন্নতা বলতে কী বুঝায়?

সকল শিশুর শেখার ধরণ এক নয়। শিশুদের এই ভিন্নতার জন্যেই বিভিন্ন শিখন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। প্রতিটি শিশুই অনন্য এবং সতন্ত্র। ফলে শ্রেণিকক্ষের অনেক শিশুর মধ্যে নানা ধরনের ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ হয়তো দ্রুত শিখে, কেউ ধীরে, কেউ হয়তো কম শুনতে বা কম দেখতে পায় ইত্যাদি।

শিশুদের ভিন্নতার ধরনসমূহ উল্লেখপূর্বক বর্ণনা করুন।

প্রতিটি শিশুই আলাদা। শ্রেণি শিশুরা একসাথে পাশাপাশি অবস্থান করলেও কেউ হয়ত লাজুক, কেউ চটপটে, কেউ দ্রুত শিখে, কেউ ধীরে, কেউ পড়ায় ভালো কিন্তু অঙ্কে কাঁচা, কেউ ক্লাসে মনোযোগী, কেউ নিজে মনোযোগী নয় আবার অন্যদেরও সমস্যা করে, কেউ অন্যদের মত ভালো দেখতে বা শুনতে পায় না। শিশুদের নানান ভিন্নতা তাদের শিখনকে প্রভাবিত করে। শিশুদের এসব ভিন্নতাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো-

শিক্ষার্থীদের শেখার ধরনগত ভিন্নতা:

হাওয়ার্ড গার্ডনার তাঁর বহুমূখী বুদ্ধিমত্তা তত্ত্বে শিক্ষার্থীদের শেখার ভিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। কেউ ভাষাগত বিষয় ভালো শেখে, কেউ গাণিতিক বিষয় ভালো শেখে, কেউ পড়ে ভালো শেখে, কেউ কাজ করার মাধ্যমে ভালো শেখে ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীদের পারগতার স্তরে ভিন্নতা:

শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতার ভিন্নতার কারণে এ ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন- কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে শেখে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধিতার কারণে সৃষ্ট ভিন্নতা:

প্রতিবন্ধিতা শিশুদের শিখনের ক্ষেত্রে প্রচুর অন্তরায় সৃষ্টি করে। যেমন- দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা ইত্যাদি কারণে অন্য শিশুদের থেকে তারা কিছুটা ভিন্ন হয়।

শিক্ষার্থীদের আচরণগত ভিন্নতা:

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আচরণের ভিত্তিতেও তাদেরকে আলাদা করা হয়। যেমন- কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে যারা শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, শিক্ষকের সাথে সহযোগিতামূলক আচরণ অথবা প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করে।

শিক্ষার্থীদের জেন্ডার ভিন্নতা:

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জেন্ডার ভিন্নতার কারণে শিশুদের শিখন কার্যক্রম প্রভাবিত হয়। তবে উন্নত দেশগুলো তেমন প্রভাবিত হয় না।

শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ভিন্নতা:

ভাষাগত ভিন্নতাও শিশুদের শিখনকে প্রভাবিত করে। বাংলাভাষী শিশুদের কাছে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও বিভিন্ন ভাষাভাষী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা (যেমন: ত্রিপুরা, লুসাই, তঞ্চঙ্গ্যা) বিদ্যালয়ে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।

শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থাগত ভিন্নতা:

শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থাগত পার্থক্য ইত্যাদি কারণেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন- যেসব শিশুর বাসায় পড়াশোনা জানা লোক নেই তাদের বাড়ির কাজ দেয়া হলে সহায়তার অভাবে তাদের পক্ষে সেটা করা সম্ভব নাও হতে পারে।

শিক্ষার্থীদের ভিন্নতা চিহ্নিতকরণ ও চাহিদা নিরূপণের উপায় লিখুন।

একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর ভিন্নতার ধরণ জানা থাকলে শিখন শেখানো কার্যক্রম সহজ হয়। কিছু লক্ষণ দেখে শিশুদের ভিন্নতা ও চাহিদা চিহ্নিত করা যায়। যেমন-

·       শিক্ষার্থী পড়ে আয়ত্ব করেতে পছন্দ করে,

·       কেউ কেউ গল্প শুনে শেখে,

·       কিছু শিক্ষার্থী যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আয়ত্ব করে,

·       কেউ কেউ ছবি বা ভিডিও দেখে শিখতে পছন্দ করে,

·       কেউ কেউ আবার প্রকৃতি থেকে শিখতে ভালবাসে,

·       এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা ছন্দ বা সঙ্গীতের মাধ্যমে শেখে ইত্যাদি।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের বুদ্ধিমত্তা রয়েছে। এমনকি একজন ব্যক্তির একাধিক বুদ্ধিমত্তা থাকতে পারে। শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রধান বুদ্ধিমত্তাকে কাছে লাগিয়ে কোন কিছু আয়ত্ব করতে শেখে। হাওয়ার্ড গার্ডনার মূলত মানুষের এই বহুমূখী বুদ্ধিমত্তার উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের ভিন্নতা চিহ্নিত করে তাদের চাহিদা অনুসারে পাঠদানের পরামর্শ দিয়েছেন।

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.