পেশাগত শিক্ষা-০১

অধ্যায়-০২: শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (শেষ অংশ)

এই ক্লাস শেষে যে যে বিষয়গুলো জানতে পারবেন:

  • সহযোজন কী?
  • আত্মকেন্দ্রিকতা কী?
  • শিশুর সামাজিক বিকাশ কী?
  • শিশুর আবেগিক বিকাশ কী?
  • শিশুর বিলম্বিত বিকাশ কী?
  • বিলম্বিত বিকাশের ক্ষেত্রে করণীয় দিকগুলো বর্ণনা দিন।
  • লেভ ভিগট্‌স্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্ব কী?
  • স্ক্যাফোল্ডিং কী?
  • ZPD কী?
  • ব্রনফেনব্রেনারের বাস্তসংস্থান তত্ত্বটি কী?
  • বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ধাপ কয়টি ও কী কী?
  • শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের প্রভাব ব্যাখ্যা করুন।

সহযোজন কী?

সহযোজন হলো পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে খাপখাইয়ে নেওয়া। অন্যভাবে বলা যায়, সহযোজন প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী ধারণা বা স্কিমাকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যাতে সেটা নতুন ধারণাকে সহজেই তার সাথে মানিয়ে নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চোষা আচরণের কথা ধরা যাক। জীবনের প্রথম মাসের মধ্যে শিশুরা বিভিন্ন বস্তু (যেমন- স্তনের বোঁটা, আঙ্গুল, দুধ, মধু বা অন্য কিছু) চোষার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করেই তারা বুঝতে শিখে যে, কিছু কিছু বস্তু আছে যা চোষা বা খাওয়া যায়। আবার কিছু জিনিস আছে যা খাওয়া যায় না।

আত্মকেন্দ্রিকতা কী?

আত্মকেন্দ্রিকতা (Egocentrism) হলো একমাত্রিক চিন্তনের ফলশ্রুতি। আত্মকেন্দ্রিকতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে শিশু নিজে। সে যা ভাবে বা করে সবকিছু তার নিজেকে ঘিরে সম্পাদিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সে মাকে চিন্তা করে ‘আমার মা’ হিসাবে আর বাবাকে ‘আমার বাবা’ হিসাবে।

স্ক্যাফোল্ডিং কী?

ভিগট্‌স্কির তাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্বে সর্বপ্রথম ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্রুনার মূলত: ভাইগট্স্কির কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৯৭৬ সালে স্ক্যাফোল্ডিং-এর ধারণাটি সামাজিক গঠনবাদের অংশ হিসেবে তাঁর মতবাদে অন্তর্ভুক্ত করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এই ধারণাটি বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভিগট্‌স্কির মতে, স্ক্যাফোল্ডিং হলো শিশুর কোনো সমস্যার সমাধান বা উত্তরণের জন্য প্রদত্ত ধারাবাহিক সহায়তা, যা শিশুর অবস্থান বুঝে ধাপে ধাপে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়। শিখনের ক্ষেত্রে শিশুর অবস্থান বুঝে শিক্ষক বা অপেক্ষাকৃত সক্ষম সঙ্গীর দ্বারা বিভিন্ন অবস্থায় স্ক্যাফোল্ড করা হয়। শিশুকে পরোক্ষভাবে সূত্র, ইঙ্গিত, উপকরণ এবং পরিবেশ দিয়ে ও প্রশ্ন করে সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করবেন, কিংবা সমস্যার সরাসরি সমাধান করে দেবেন, অথবা তাদেরকে সুযোগ করে দেবেন নিজে থেকে সমস্যাটির সমাধান করতে পারার, যার পুরোটাই নির্ভর করবে শিশুর বিকাশের অবস্থানের  ওপর।

ZPD কী?

ZPD এর পূর্ণরূপ হলো ‘Zone of Proximal Development’ যার বাংলা অর্থ ‘বিকাশের নিকটবর্তী অঞ্চল’ বা ‘দৃঢ়িকরণ’। ভিগট্‌স্কির তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো Zone of Proximal Development (ZPD) ।  ভিগট্‌স্কির মতে জ্ঞানমূলক বিকাশের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যাকে তিনি বলেছেন Zone of Proximal Development । এর অর্থ হলো শিশুর বিকাশ শুরু হতে থাকে যখন সে সামাজিক আচরণে সম্পৃক্ত হয় এবং এর পরিপূর্ণ বিকাশ নির্ভর করে। ZPD হলো কোনো পরিস্থিতি বা সমস্যা যখন শিশুর সামর্থ্য বা চিন্তা ক্ষমতার কিছুটা উপরের স্তরে থাকে তখন শিক্ষক বা পিতা-মাতা অথবা অপেক্ষাকৃত সক্ষম সাথি ইশারা, ইঙ্গিত, উপকরণ, সূত্র ধরিয়ে দিয়ে বা প্রশ্ন করে নিজে থেকে সমাধান খুঁজে পেতে শিশুকে সহায়তা করেন। শিশুর একা কোনো কাজ করার সামর্থ্য এবং অন্যের সাহায্য নিয়ে কাজ করার সামর্থ্যরে মধ্যে যে এলাকা বা স্তর তা-ই ZPD ।

শিশুর সামাজিক বিকাশ কী?

জন্মের পর থেকেই অত্যন্ত যত্ন সহকারে শিশুর চাহিদা পূরণ করার মধ্য দিয়ে মা এবং আপনজন শিশুকে সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলেন। এসময়ে তারা শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করেন, খাওয়ান, যত্নাদি করেন, যার মাধ্যমে শিশুর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়সমূহ উদ্দীপিত হয়, শিশু আরাম ও পরিতৃপ্তি লাভ করে এর মধ্য দিয়ে আশ্বস্ততা এবং বিশ্বস্ততার সূচনা হয়। উদ্দীপনা শিশুকে আনন্দ দেয়, পরিতৃপ্ত করে ফলে শিশু ও মায়ের মধ্যে মধুর সম্পর্কের দ্বারা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। আর যেসকল শিশু যত্ন  থেকে বঞ্চিত হয় তাদের মধ্যে হিংসা, আক্রমণাত্মক, নেতিবাচক, কলহপ্রবণ এবং অসহযোগী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। দুই মাস বয়সে শিশুর মধ্যে সামাজিক হাসি লক্ষ্য করা যায়।

শিশুর আবেগিক বিকাশ কী?

খুশি হলে হাসা, ব্যথা পেলে কাঁদা, কোন কিছু চেয়ে না পেলে জেদ করা ইত্যাদি আবেগের বহি:প্রকাশ। নবজাত শিশুর মধ্যে অবিমিশ্র উত্তেজনা হল প্রথম আবেগ। জীববিদদের মতে মস্তিষ্কের থ্যালামাস আবেগের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং এ্যড্রিনাল গ্রন্থির নিঃসরণ- এ্যড্রিনালিন আবেগকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালিত করে। আবেগ দুই প্রকার ধনাত্মক হাসি, আনন্দ, স্নেহ-ভালবাসার অনুভূতির প্র্রকাশ ও অন্য দিকে ক্রোধ, ভয়, আক্রমণাত্মক আচরণ, এড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি নেতিবাচক আবেগ। আবেগের গঠনমূলক ও ধ্বংসাত্মক, দুটো দিক রয়েছে। শিশু  ইতিবাচকভাবে পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে সমবয়সী ও বড়দের সাথে সম্পর্কস্থাপন করা ও বজায় রাখা, অর্থাৎ প্রচেষ্টা ও ভুল, অনুকরণ, সাপেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের দ্বারা আবেগের নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভাল লাগা, মন্দ লাগা, আবেগ অনুভূতির সঠিক ভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করে। মূল্যবোধ, আদর্শ, অন্যের প্রতি আগ্রহ ও অন্যের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা, সামাজিক রীতি-নীতির প্রতি সম্মান, নিজের হিত চিন্তা ইত্যাদি শিশুর আবেগময় জীবনকে প্রভাবিত করে।

শিশুর বিলম্বিত বিকাশ কী?

যখন কোন শিশু সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের তুলনার পিছিয়ে থাকে অর্থাৎ যে বয়সে যা যা করতে পারার কথা তা করতে পারেনা তখন সেই অবস্থাকে শিশুর বিলম্বিত বিকাশ বলা হয়। কোন বিশেষ কারনে একটি শিশু যদি তার সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে পিছিয়ে পড়ে তবে ঐ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার আচরণিক সমস্যা হয়। যেমন-

  • বুদ্ধি বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লে বুদ্ধি করে কথা বলতে পারবে না বা কাজ করতে পারবে না।
  • শারীরিক বিকাশে বিঘ্ন হলে জিনিস ধরতে, তুলতে, নিতে- দিতে পারবে না, হাঁটা চলায় সমস্যা হয়।
  • ভাষা যোগাযোগে পিছিয়ে পড়লে কথা বলা, ভাব বিনিময়ে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়।
  • নিজের প্রয়োজন বুঝাতে পারবে না, ফলে জীবন অনেক বেশি স্থবির হয়ে পড়বে।

বিলম্বিত বিকাশের ক্ষেত্রে করণীয় দিকগুলো বর্ণনা দিন।

বিলম্বিত বিকাশের ক্ষেত্রে করণীয়:

১. শিশুর বয়স, সামর্থ্য ও আগ্রহ বা অনুরাগ, ভাল লাগা, মন্দ লাগা অর্থাৎ শিশুকে পরিপূর্ণভাবে বুঝা;

২. শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা;

৩. শিশুর স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা;

৪. প্রতি বিষয়ে বা কর্মকান্ডে শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;

৫. শিশুর পরিবেশকে অনেক বেশি উদ্দীপনাময় করা;

৬. উপযোগী উদ্দীপকের দ্বারা বারবার, বিভিন্নভাবে একটি বিষয় অনুশীলন করানো;

৭. শিশুর একাকীত্ব দূর করার জন্য সঙ্গ দেওয়া;

৮. পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা;

৯. শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকা;

১০. শিশুর বেড়ে ওঠা বা শিখনের জন্য শিখন উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা;

১১. খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ রাখা;

১২. শিশুর সকল কর্মকান্ড বন্ধুসুলভ ভাবে মনিটরিং করা;

লেভ ভিগট্‌স্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্ব কী?

রাশিয়ান বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ভিগট্‌স্কির (Lev Vygotsky ) সামাজিক-সাংস্কৃতিক (Sociocultural) তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। ভিগট্‌স্কির শিখন মতবাদের মূলধারণা হলো সামাজিক মিথস্ক্রিয়া (Social interaction) অর্থাৎ সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে সক্রিয় মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জ্ঞানের কাঠামোতে পরিবর্তনের ফলে তার জ্ঞানমূলক বা বুদ্ধি বিকাশ ঘটে। ভিগট্‌স্কির মনে করেন এই মিথস্ক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ভাষা। এছাড়া তিনি তাঁর ‘Thought and Language’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, শিশুরধারণার বিকাশও তার ভাষার ওপর নির্ভরশীল।  তাঁর মতে, চিন্তন (thinking) এবং শিক্ষণ (learning) শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ (inner) এবং স্বতন্ত্র্য (individual) প্রক্রিয়া নয়। এগুলো সাধারণত: বুদ্ধিবৃত্তীয় বিকাশ, ভাষা, সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া (social interaction) এবং সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।

ভিগট্‌স্কির তত্ত্বের ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিশেষ আবিষ্কার হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, স্ক্যাফোল্ডিং হলো শিশুর কোনো সমস্যার সমাধান বা উত্তরণের জন্য প্রদত্ত ধারাবাহিক সহায়তা, যা শিশুর অবস্থান বুঝে ধাপে ধাপে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়। কিছু কিছু কাজ শিশুদের জন্য একা করা বেশ কষ্টসাধ্য কিন্তু সেই কাজটিই কোনো পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি অথবা একজন অপেক্ষাকৃত অধিক দক্ষ শিশুর সহায়তা নিয়ে তারা সহজে করতে পারে। শিশুর জ্ঞানের এই দুইটি পর্যায়ের ব্যবধানকে তিনি Zone of Proximal Development (ZPD) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ব্রনফ্রেনব্রেনারের বাস্তুসংস্থান তত্ত্বটি কী?

শিশুর শিখন ও বিকাশে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সাধারণত তার নিকট পরিবেশ থেকে শেখে। শিশুর চারপাশের পরিবেশ তার জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। পরিবেশের প্রভাবের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে, গতানুগতিক ধারণা ও তত্ত্বের বাইরে অনেকটা ব্যতিক্রমধর্মী ও কার্যকরী ধারণার উদ্ভাবন করেন ব্রনফেনব্রেনার নামক একজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী। তাঁর এ তত্ত্বটি বাস্তুসংস্থান তত্ত্ব (Ecological System Theory) নামে পরিচিত। তার মতে, শিশু শুধু শিশু নয়, সে একটি পরিবারের অংশ,পাড়ার একজন সক্রিয় সদস্য, আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (বিদ্যালয়/ ক্লাব/ দলের) সমাজ এবং রাষ্ট্রেরও একজন নাগরিক। এই তত্ত্বের শিশুকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রতি জোর দিয়ে মতামত ব্যক্ত করা হয়। বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের মূল কথা হলো- শিশুর পরিবেশ, পরিবেশের বিভিন্ন সদস্য ও উপাদান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বৃহত্তর সমাজ ও এগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান সিস্টেম শিশুর শিখন ও বিকাশে প্রভাব বিস্তার করে।

বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ধাপ কয়টি ও কী কী?

১. মাইক্রো সিস্টেম:

এ চক্রের প্রথম স্তরে শিশুর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব, সকল অভিজ্ঞতা, সকল প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সহযোগে মাইক্রো সিস্টেম অংশটি গঠিত। পরিবার, শিশু সেবাকারী এবং সহকারী, বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিশু চিকিৎসাসেবা, সামাজিক সেবা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানও শিশু কর্তৃক প্রভাবিত হয়। যেমন-শিশু তার পরিবারের লোকজন এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক প্রভাবিত হয়। একইভাবে শিশুর আচরণের ফলে তাদেরও মানসিক পরিবর্তন আসে।

২. মেসো সিস্টেম:

মাইক্রো সিস্টেমে একজন দ্বারা অন্যজনের প্রভাবিত হওয়ার মাধ্যমে বা পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার কারণেই বাস্তবিদ্যার দ্বিতীয় স্তরের সৃষ্টি হয়,যাকে তিনি নাম দিয়েছেন মেসো সিস্টেম। এর মাধ্যমে একটি সম্পর্কের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। মেসো সিস্টেমে যখন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে দৃঢ় সহযোগিতা এবং যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বানুযায়ী শিশুর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

৩. এক্সো সিস্টেম:

শিশুর উন্নয়নের ওপর প্রভাবকারী পরিবেশের এই ধাপ (এক্সো সিস্টেম) যা ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরস্পর সংযুক্তি ক্সতরি করে, তবে তা শিশুর জীবনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে না। কিন্তু পরোক্ষভাবে তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। দেখা যায় যে, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি ব্যবস্থা, ধর্মীয় অবস্থা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ ভাবে শিশুর সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়তা না করলেও শিশুর পরিবার, পিতা-মাতাকে সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সহায়তা করে, যা পরোক্ষ ভাবে শিশুর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষভাবে শিশুর শিখন ও সার্বিক বিকাশে প্রভাব ফেলে। যেমন-একটি দেশ যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করে, কিংবা বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন বা শিশু অধিকার সম্পর্কে কার্যকরী বিধি-বিধান প্রণয়ন করে, তা শিশুর বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

৪. ম্যাক্রো সিস্টেম:

এটা বা সংস্থান চক্রের শেষ বা চূড়ান্ত ধাপ। এখানে মূলত সমাজে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আদর্শের দিকগুলোর কথা বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় শিশুর উন্নয়নে এর সংশ্লিষ্টতা নেই, কিন্তু বাস্তবে শিশুর সার্বিক উন্নয়নে এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন-যে সমাজে শিশু নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় সেখানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা কম ঘটে। একইভাবে যে সমাজ বা রাষ্ট্র শিশুর বিকাশের উপযোগী আইন তৈরি করে সেখানে শিশু যেভাবে বেড়ে উঠবে, যে সমাজে এ ধরনের সংস্কৃতি ও মূলবোধ নেই সেখানে অন্যভাবে বেড়ে উঠবে।

৫. ক্রোনো সিস্টেম:

এটি ইউরি ব্রনফেনব্রেনার কর্তৃক প্রদত্ত কোনো ধাপ নয়। পরবর্তীতে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ধাপগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, শিশু এসব ধাপ দ্বারা সৃষ্ট প্রভাবের বাইরেও কোনো ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যেমন-পারিবারিক বিপর্যয়, সামাজিক বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বিষয় শিশুকে প্রভাবিত করে। বলা হয়ে থাকে, যে কোন প্রাকৃতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিপর্যয়ে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, যখন বাবামায়ের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে অথবা সামুদ্রিক জলোচ্ছাস হয় তখন শিশুরাই মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। এসব ঘটনাকে ক্রোনো সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের প্রভাব ব্যাখ্যা করুন।

বাস্তুসংস্থান তত্ত্বটি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিশুকে শুধু একক শিশু হিসেবে না দেখে তাকে পরিবারের, গ্রাম, বন্ধু-বান্ধব, বিদ্যালয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শিশু-বান্ধব শিখন ও বিকাশ উপযোগী পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি, রাষ্ট্র ও সমাজ উপহার দেয়া যা তাকে সার্বিক বিকাশে বিকশিত করে তুলতে সহায়তা করে। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে বা বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বাস্তুসংস্থান তত্ত্বের  কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • শিশু যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে সেই পরিবেশের যাবতীয় উপাদান শিশুটির বিকাশ ও শিখনে প্রভাব ফেলে।
  • শিশুর লালন-পালনের সাথে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে শিশুটির বেড়ে উঠার প্রভাব থাকে বিধায় এগুলো তার শিখনে প্রভাব ফেলে।
  • শিশুটি যখন বড় হতে থাকে তখন তার আশপাশে যে সমস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থাকে তারা শিশুটির বিকাশে ভূমিকা রাখে।
  • সমাজের সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি ইত্যদির প্রভাবও শিশুটির ওপর পড়তে থাকে।
  • রাষ্ট্রীয় নীতিমালা কেমন তার ওপর নির্ভর করে শিশুটির সাথে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কী ধরনের আচরণ করছে বা সেবা প্রদান করছে এ সবই শিশুর আচরণ গঠনে সহায়তা করে।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তক কেমন হবে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কেমন আচরণ করবেন, পাঠদান পদ্ধতি কেমন হবে এতদ্সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় ঐ দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।
  • কোনো রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও শিশুদের বেশি প্রভাবিত হতে দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায় যে, শিশুর নানাবিধ বিকাশে বাস্তুসংস্থানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থানের এসকল প্রভাব শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ণ থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

proshikkhon

View Comments

  • শিশুর বিকাশে বিভিন্ন ক্ষেত্র/ডোমেইন (শারীরিক ও সঞ্চালনমূলক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, আবেগিক, ভাষা ও যোগাযোগ, আত্ম-নির্ভরশীলতা, খেলা) নিয়ে হ্যান্ডনোট দিবেন দয়া করে

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.