কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research) বলতে কী বোঝায়?
অনুবাদ করলে অ্যাকশন রিসার্চ কথাটার অর্থ দাঁড়ায় কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research)। ইংরেজিটা বহুল প্রচলিত হলেও বাংলা “কর্মসহায়ক গবেষণা” রাখা হয়েছে সহজে বোঝার জন্য। অ্যাকশন বলতে কোনো কার্যক্রম বুঝায় এবং রিসার্চ অর্থ গবেষণা। গবেষণা বলতে প্রকৃতপক্ষে বোঝায় উদ্ভূত কোনো সমস্যার বিষয়ে অনুসন্ধান এবং অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সমাধান বের করার কার্যক্রম। সুতরাং কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research) বলতে প্রকৃতপক্ষে বোঝায় কোনো সমস্যার কারন বের করে সমাধান খুঁজে পাওয়ার কার্যক্রম।
কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research) অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও নিজস্ব পরিসরে এবং সরল উপায়ে সম্পাদন করা যায়; এরুপ গবেষণায় আর্থিক সংশ্লেষ অতি সামান্য। ডিপিএড কর্মসূচিতে কর্মসহায়ক গবেষণা গাঠনিক মূল্যায়নের একটি টুলস অথবা প্রক্রিয়া হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কর্মসহায়ক গবেষণাকে পেশাগত উন্নয়নের একটি কার্যকর প্রক্রিয়া হিসাবে শিক্ষাসহ অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ডিপিএড কর্মসূচিতেও কর্মসহায়ক গবেষণা একজন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের কার্যকর টুলস হিসাবে ব্যবহার করা হবে, এ প্রত্যাশায় এ গবেষণা প্রক্রিয়া অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ডিপিএড কর্মসূচিতে শুধু মাত্র বাংলা, ইংরেজি এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয় একটি করে অ্যকশন রিসার্চ সম্পাদন করার কথা বলা হয়েছে। অ্যকশন রিসার্চ ২য় টার্মের ১ম সপ্তাহ থেকে শুরু করতে হবে। ২য় এবং ৩য় টার্মের ২য় সপ্তাহের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন করতে হবে এবং তৃতীয় টার্মের মধ্যে তা লিখে জমা দিতে হবে। ইংরেজি বিষয়ে অ্যকশন রিসার্চ ইংরেজি ভাষায় লেখা বাঞ্ছনীয় তবে পিটিআই সুপারের নিকট থেকে বিশেষ অনুমতিক্রমে বাংলাতেও লেখা যেতে পারে।
অ্যকশন রিসার্চের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর নিম্নলিখিত জ্ঞান ও দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। যথা:
জ্ঞান : শিক্ষাক্রম, বিষয়জ্ঞান, শিক্ষণবিজ্ঞান, শিশুর বিকাশ ও আচরণ এবং অন্যান্য জ্ঞান
দক্ষতা : পরিকল্পনা করার দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা, লেখার দক্ষতা, অনুচিন্তনের দক্ষতা ইত্যাদি
কর্মসহায়ক গবেষণা সম্পাদন করার ক্ষেত্র হিসেবে প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ের কার্যক্রমকেই নির্বাচন করতে হবে। প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে তৃতীয় টার্মের মধ্যেই অন্যান্য অনুশীলন কার্যক্রমের পাশাপাশি অ্যাকশন রিসার্চের কাজগুলো সম্পাদন করতে হবে।
সমস্যা নির্বাচনের জন্য বিদ্যালয়ের অথবা শ্রেণি কার্যক্রম সম্পর্কিত সমস্যা বাছাই করলে ভালো হয়। যেমন : দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, অনেক শিক্ষার্থী শনিবার টিফিনের পর বিদ্যালয় ত্যাগ করে, এরূপ বিষয়গুলো সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। শ্রেণি কার্যক্রম সম্পর্কিত সমস্যা হতে পারে: দ্বিতীয় শ্রেণির বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বাংলা হাতের লেখা খুব খারাপ, তৃতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীর স্থানীয় মান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই, বাংলা সাবলীলভাবে পড়তে পারে না, তৃতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি Letter চেনে না বা পড়তে পারে না অথবা তৃতীয় শ্রেণির ৪ জন শিক্ষার্থী শিখনের ক্ষেত্রে ধীরগতিসম্পন্ন। সমস্যা নির্বাচনের উপায় হিসাবে বেসলাইন মূল্যায়ন অথবা যেকোনো পাক্ষিক মূল্যায়নের ফলাফলকে বেছে নেয়া যেতে পারে।
যেকোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে প্রথমে তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করতে পারলে তার সমাধানের পথও পাওয়া যায়। সমস্যার কারণ উদঘাটনের জন্য বিভিন্ন উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিদ্যালয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মীর নিকট থেকে সমস্যার ধরন ও প্রয়োজন বুঝে সাক্ষাৎকার বা প্রশ্নমালা পূরণ করার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। যেমন-শিক্ষার্থী কেন বাংলা সাবলীলভাবে পড়তে পারে না তা জানার জন্য শিক্ষার্থী ও সহকর্মী বাংলার শিক্ষকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যেতে পারে। আবার শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ জানার জন্য শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবকের নিকট থেকে তথ্য জানতে হবে।
সমস্যার অনুমিত সমাধান খুঁজে বের করা : সমস্যার অনুমিত সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সহপাঠী শ্রেণি শিক্ষকের সহায়তা নিতে হবে এবং নিজেও চিন্তা করে সমাধান বের করতে হবে। যেমন- অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে সমাধান হতে পারে উক্ত শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ব্রিগেড করে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে বিদ্যালয়ের নিয়মিত উপস্থিত থাকার সুফল সম্পর্কে বলা, শিক্ষক নিজেও অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে মা-বাবাকে বোঝাতে পারেন, নিয়মিত উপস্থিত থাকার জন্য সামান্য কিছু পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে পারেন, সামান্য কিছু টিফিনের ব্যবস্থা করা যায়।
স্থানীয় মান সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুশীলন করা, শিক্ষার্থীদের এগারো, বারো বা এরূপ সংখ্যা পড়ার ক্ষেত্রে দুই দশ এক, দুই দশ দুই পড়া-লেখা অনুশীলন করা, কাঠি ছাড়াও অন্যান্য বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে স্থানীয় মানের ধারণা দেয়া যেতে পারে। অনুরূপভাবে হাতের লেখার সমস্যার ক্ষেত্রেও সমাধানের উপায় খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
সমস্যা এবং অনুমিত সমাধান চিহ্নিত করার পর শিক্ষার্থী একটি লিখিত পরিকল্পনা এবং পাঠপর্যবেক্ষণ চেকলিস্ট তৈরি করতে পারে। লিখিত পরিকল্পনা নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শ্রেণি শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ইনস্ট্রাক্টরের সাথে আলোচনা করতে হবে। ইনস্ট্রাক্টর লিখিত পরিকল্পনা অনুমোদন করবেন। (যেমন সমস্যা এবং অনুমিত সমাধান লিখে পরবর্তী এক মাস কী কী করবে তার তারিখ ও কাজের তালিকা তৈরি করতে পারে। সমস্যা লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নাম ও রোল নং, সমস্যা চিহ্নিত করার তারিখ এবং কীভাবে চিহ্নিত করা হলো তার বিবরণ থাকলে ভালো হয়।
সমাধান লেখার ক্ষেত্রে পাক্ষিক পাঠ পরিকল্পনার ছকে শিখন শেখানো কাজের বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হবে। পাক্ষিক মূল্যায়ন কীভাবে করা হবে তাও লিখতে হবে। এভাবে ২টি পাক্ষিক, দৈনিক পরিকল্পনা ও পাক্ষিক মূল্যায়নের বিবরণ কর্মসহায়ক গবেষণা পরিকল্পনায় লেখা থাকবে।
পরিকল্পনায় অনুমিত সমাধান বাস্তবায়ন করার একটি সময় নির্ধারণ করতে হবে। সমাধান বাস্তবায়ন করার কয়েকটি ধাপ থাকতে হবে। প্রতিটি ধাপের কাজ সম্পাদনের পর একটি মূল্যায়ন থাকতে হবে এবং মূল্যায়নের ফলাফল অনুসারে পরবর্তী ধাপের পরিকল্পিত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিকল্পনায় উল্লিখিত নির্ধারিত সময়ের পরে মূল্যায়ন করে দেখাতে হবে সমস্যার কতটা সমাধান হয়েছে অর্থ্যৎ চিহ্নিত শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়েছে। এ সমাধানের আলোকে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী উন্নয়নের কার্যক্রম নির্ধারণ করে আবারো গবেষণা পরিচালনা করা যেতে পারে। এভাবে দেখা যায় কর্মসহায়ক গবেষণা একটি চক্রের (ঈুপষব) আকারে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।
কর্মসহায়ক গবেষণা বাস্তবায়ন প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ে প্রতিদিনের নির্ধারিত কার্যক্রমের মাধ্যমেই সম্পাদন করতে হবে। তবে গবেষণা পরিচালনার জন্য শ্রেণি শিক্ষক, সহপাঠী শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষককে নিয়ে একটি দল গঠন করতে হবে। পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর উক্ত দলের পরামর্শক হিসেবে কাজ করবেন। তবে এরূপ দলের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিকভাবে পাঠপর্যবেক্ষণ করে ফিডব্যাক প্রদান করা ছাড়া অতিরিক্ত কোনো কাজ করতে হবে না (পাঠপর্যবেক্ষণের কাজটি সহপাঠী শিক্ষক ও শ্রেণি শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষকের অন্যতম একটি কাজ)। তবে চিহ্নিত শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ছোট দলের কাজ, মিশ্র দলে একাকী কাজের মাধ্যমে সম্পাদনের পরিকল্পনা করতে পারলে ভালো হয়। এভাবে পরিকল্পনা অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমিত সমাধানের কার্যক্রমগুলো সম্পাদন করে দেখতে হবে ফলাফল কী দাঁড়ায়।
কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে শ্রেণি শিক্ষক অথবা সহপাঠী শিক্ষার্থীর নিকট থেকে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে ফিডব্যাক গ্রহণ করতে হবে। রিফ্লেকটিভ জার্নালে প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পাদনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকতে হবে।
১. ভূমিকা :
২. গবেষণার উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা :
৩. সমস্যার বিবরণ :
৪. গবেষণা পরিকল্পনার জন্য দল গঠন
৫. সমস্যার কারণ :
৬. সমস্যার অনুমিত সমাধান ও সমাধান করার উপায় (উপকরণসহ কার্যক্রম):
৭. সমাধান বাস্তবায়ন পরিকল্পনা :
৮. সমাধান কীভাবে করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণের (রিফ্লেকটিভ জার্নাল অনুসারে) ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও তার ফলাফল উল্লেখ করতে হবে।
৯. গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল বর্ণনা। ফলাফল বর্ণনায় বেসলাইন মূল্যায়ন তথ্যের সাথে তুলনা থাকতে হবে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
১০. উপসংহার।
| মানদণ্ড | বিষয় | মন্তব্য | প্রাপ্ত নম্বর |
| সমস্যা নির্ধারণ এবং কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন | সমস্যা চিহ্নিত করার মাধ্যমে কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন।সমস্যা উল্লেখ করে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা।সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা যেমন- বেসলাইন থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে ফলাফল বের করা।শ্রেণিকক্ষের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা এবং কীভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে তা বর্ণনা করা। | ৫ | |
| কর্ম পরিকল্পনা অনুসারে অ্যাকশন রিসার্চ বাস্তবায়ন | শ্রেণি শিক্ষক, সহপাঠিী শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক সমন্বয়ে দল গঠন। পাক্ষিক ও দৈনিক পরিকল্পনা, পাক্ষিক মূল্যায়ন, পাক্ষিক মূল্যায়ন অনুসারে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রেণিতে পাঠ পরিকল্পনা অনুসারে শিখন শেখানো কাজ পরিচালনার বিবরণ শ্রেণি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যের বিবরণ। পাক্ষিক মূল্যায়ন তুলনা করে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ | ৭ | |
| ফলাফল | বিভিন্ন ধরনের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ফলাফল বর্ণনা (সারণি ব্যবহার করে) ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। | ৫ | |
| উপসংহার ও সুপারিশ | ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা উল্লেখপূর্বক গবেষণাকাজের সফল সমাপ্তি করা ও সুপারিশ গ্রহণ করা | ৩ | |
| মোট নম্বর | ২০ |
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
This website uses cookies.
View Comments
কর্মসহায়ক গবেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলাম
ধন্যবাদ স্যার 🌹