পাঠ-৪.২: দুরের পাল্লা (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)
১. ‘দূরের পাল্লা’ ছড়া অবলম্বনে নদী তীরের দৃশ্যের বর্ণনা দিন।
ছন্দের যাদুকর নামে খ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা কবিতায় দৃশ্যপট অঙ্কনে শিল্পমনের পরিচয় দিয়েছেন। প্রকৃতি নির্ভর কবিতা রচনাতে তিনি স্বহস্তে যে সব দৃশ্যের অবতারণা করেছেন, তা সত্যিই তাকে একজন সব্যসাচী শিল্পী বলা যায়। তার দূরের পাল্লা কবিতায় নদীতীরের দৃশ্যের এক নান্দনিক অবতারণা ঘটেছে। নদীর পাড়ে ঝোপঝাড়, নদীর জলে শৈবাল, আর নদীর বাঁকে বাকে রয়েছে চর। জলে রয়েছে পানকৌড়ি, ক্ষেতে আছে রূপালি ধান, এখানে এভাবেই পল্লিবাংলার এক অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নদীতীরের অপূর্ব নান্দনিক রূপ সৌন্দর্য কলমের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এ দৃশ্য যেকোনা শিল্পমনা মানুষের মনকে আন্দোলিত করবে তাতে কোনাে সন্দেহ নেই।
২. সত্যেন্দ্রনাথের ‘দুরের পাল্লা’ কবিতাটির ভাববস্তু ও বিষয়বস্তু আলোচনা করুন।
রবীন্দ্র-স্নেহছায়ায় যেসব কবি কাব্যসৃষ্টিতে বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। পিতামহ অক্ষয়কুমার দত্তের বিজ্ঞানদৃষ্টি ও তথ্যনিষ্ঠা তিনি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন বলে কাব্যভাবনায় তার প্রভাব পড়ে। তাঁর কবিতার বিষয় বৈচিত্র্যের মধ্যে বস্তুজ্ঞানের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাসবোধ, স্বদেশ চিন্তা, প্রাত্যহিক জীবনাচরণ ও ভাষাবিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রে তার কাব্যভাবনার বিচরণ ছিল বন্ধনহীন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের সাধক ও সমাজসচেতন ব্যক্তি। এ কারণে তার কাব্যে বিজ্ঞানানুরাগ, ঐতিহ্যপ্রীতি, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলতা ও অনাচারের বিচিত্র বিষয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মানবতাবােধ ও স্বদেশপ্রেম তাঁর কবিতার মহােত্তম উপাদান বলে গণ্য করা হয়। এ স্বতন্ত্র জীবনবােধ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে রবীন্দ্রবলয়ের কবিদের থেকে পৃথক মর্যাদা দান করেছে এবং তাঁর বস্তুচেতনা ও ইতিহাসবােধের কারণে রবীন্দ্রোত্তর কবিরা তাঁর কাব্যভাবনার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মােটকথা, রবীন্দ্রবলয় প্রভাবমুক্ত এ কবি কবিতার অবয়ব নির্মাণে স্বাতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাই তাে তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে ভিন্ন মাত্রা সংযােজিত হয়েছিল এবং পাঠকের হৃদয় হরন করেছিল।
৩. ‘দুরের পাল্লা’ কবিতার মূলভাব নিজের ভাষায় লিখুন।
বাংলা কাব্য সাহিত্যে ছন্দের যাদুকর হিসেবে খ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার কবিতা রচনার ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্তের পরিচয় দিয়েছেন । দূরের পাল্লা, তাঁর প্রকৃতি সচেতনমূলক একটি কবিতা। নৌকায় তিনটি দাঁড় নিয়ে তিনজন মাঝি দিনের চার প্রহরেই দূর পাল্লায় যাচ্ছে। তাদের নৌকার গতি অত্যন্ত শ্লথ। চলার সময়ে মাঝিরা নদীর দুই তীরের ঝোপঝাড় জঙ্গল অতিক্রম করছে। পানির শৈবালকে সবুজ পান্নার টাকশালের মতাে লাগছে। তারা আরাে দেখছে বুনো হাঁস তার ডিম কীভাবে শ্যাওলা দিয়ে ঢাকছে। পানকৌড়ি এবং ঘােমটা পর বৌ টুপটুপ করে পানিতে ডুব দিচ্ছে। দুজনারই পানিতে ডুব দেবার মধ্যে চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গাঁয়ের বধুর কলসিতে পানি ভরার অংশ ঝংকৃত শব্দ, ঘােমটার মাঝে বৌয়ের উম্মুখতা, অবশেষে মাঝিরা তাদের গতি ধীর করে এবং গান করে। তারা বাংলাদেশের রূপালি ধান, কূপসীর শাড়ি পরিহিত মিষ্টি হাসির বাংলার প্রশংসা করছে সুরে সুরে। মােট কথা দূরের পাল্লা, কবিতার ভাববস্তু শিল্প আঙ্গিকে ভাস্বর।
৪. কবিতাটি অবলম্বনে সত্যেন্দ্রনাথের ছন্দ-ভাবনা সম্পর্কে লিখুন।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে ছন্দের রাজা ও ছন্দের যাদুকর বলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করেছিলেন। বাংলা কাব্যে ছন্দের বৈচিত্র্য আনয়নে তিনি সংস্কৃত ও নানা ভাষার কবিতা থেকে অনুবাদে নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। আরবি, ফারসি ও লােকজ শব্দের অকৃপণ ব্যবহারে তিনি বাংলা কবিতার নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ এবং বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাকচাতুর্য ও বাকবৈদগ্ধে তাঁর কবিতা রূপ-চিত্রময়, ছন্দের দোলায় কম্পমান ও গতিশীল। তার ‘দূরের পাল্লা’, ‘পালকির গান’ ও অন্যান্য অসংখ্য কবিতায় যেন গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতির জীবন্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মেলা। দূরের পাল্লা কবিতাটিকে স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বদ্ধাক্ষর এবং মুক্তাক্ষরকে একমাত্রা হিসেবে পড়া চলে। এজন্য বলা যায়, বাংলা কাব্যে তাঁর মতাে ছন্দ সচেতন কবির তুলনা মেলা ভার। তাই তাে তিনি বাংলা সাহিত্যে ছন্দের জাদুকর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
৫. পানকৌড়ির সাথে ঘোমটা পরা বউটির তুলনা করা হয়েছে কেন?
‘দূরের পাল্লা’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব বাণীবিন্যাস । কবিতায় কবি মাঝির নৌকা, নদীর দুইতীর, ঝােপঝাড়, জঙ্গল, পানিতে শৈবালদামের বর্ণনা করেছেন। একইভাবে বুঁনােহাস ও শ্যাওলার পরিচয় দেন, পানকৌড়ি যেভাবে পানিতে ডুব দেয় অনুরূপভাবে ঘােমটা পড়া বধু টুপটুপ করে পানিতে ডুব দেয়। তাই পানকৌড়ির সঙ্গে ঘােমটা পরা বউটির তুলনা করা হয়েছে।
৬. সত্যেন্দ্রনাথ ছন্দের- ‘দূরের পাল্লা’ কবিতার ছন্দ-বিন্যাসের আলোকে কথাটির যথার্থতা বিচার করুন।
রবীন্দ্র কাব্যবলয়ে যে কয়জন কবি কাব্য সৃষ্টিতে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন কবিতায় ছদের রাজা। তাঁর কবিতার অবয়ব ছন্দ সৌষ্ঠব ও অলংকারকে ভরপুর। বাংলা কাব্যে ছন্দের বৈচিত্র্য আনয়নে তিনি সলস্কৃত ও নানা ভাষার কবিতা থেকে অনুবাদে নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। আরবি-ফারসি ও লােকজ শব্দের অকৃপণ ব্যবহারে তিনি বাংলা কবিতায় নতুন কাব্য ভাষা নির্মাণ এবং বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন :
” ” ” ” রূপশালি/ধান বুঝি → চারমাত্রা ” ” ” ” এই দেশে সৃষ্টি → চার মাত্রা ” ” ” ” ধূপছায়া/ যার শাড়ি→ চার মাত্রা উপর্যুক্ত কবিতাংশে দেখা যায়, প্রতিটি পর্ব চার মাত্রা বিন্যাস অর্থাৎ কবিতাটি স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। কবি এভাবে দূরের পাল্লা কবিতার প্রতিটি পর্ব চার মাত্রা বিন্যাসে স্বরবৃত্ত ছন্দের গঠন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কবিতার কাব্য শৈলী নির্মাণ করেছেন। বাক চাতুর্য ও বাকবৈদদ্ধে তাঁর কবিতা রূপ চিত্রময়, ছন্দের দোলায় কম্পমান ও গতিশীল। তাঁর ‘দূরের পাল্লা’ কবিতায় যেন গ্রাম বাংলার জীবন ও প্রকৃতির জীবন্ত প্রদর্শনীর মেলা। ‘দূরের পাল্লা’ কবিতাটিকে স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বদ্ধাক্ষর এবং মুক্তাক্ষরকে একমাত্রা হিসেবে পড়া চলে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে ছন্দের রাজা ও ছন্দের যাদুকর বলে প্রশংসা করেছেন।
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
This website uses cookies.