বাংলা (এসকে)

বাংলা (এসকে); অধ্যায়-৪ ষোলো আনাই মিছে

পাঠ-৪.১: ষোলো আনাই মিছে (সুকুমার রায়)

১. সুকুমার রায় তাঁর ‘ষোলাে আনাই মিছে’ কবিতায় রূপকের অন্তরালে এক গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ করেছেন”-আলােচনা করুন।

বাংলা ছড়ার জগতে সুকুমার রায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তাঁর জাদুকরী হাতের স্পর্শে ছড়াকে মানুষের মনিকোঠায় পৌছে দিয়েছেন। শুধু আনন্দদানই তাঁর ছড়ার মূল লক্ষ্য নয় বরং তিনি কিছু কিছু ছড়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি জীবনযাত্রা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ছড়া হলাে “ষোলাে আনাই মিছে”। এ ছড়াটির মধ্য দিয়ে তিনি হালকা চালের মধ্য দিয়ে বাঙালি সাহেবদের চারিত্রিক মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ছড়াটির সাধারণ অর্থ হলাে লেখাপড়া জানা এক বাবু মশাই শখের বশে এক মাঝির নৌকায় চড়ে বসেন। নৌকায় ওঠার পর মাঝির সঙ্গে তার কথােপকথন হয়।

বলা যায়, মাঝি ও বাবু মশাইয়ের কথোপকথনকে কেন্দ্র করেই এই ছড়ার মূল বিষয়বস্তু ফুটে উঠেছে।আর এই দিক হতে ছড়াটিকে সংলাপনির্ভর ছাড়াও বলা যায়। বাবু মশাই বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী মানুষ। তিনি মাঝিকে সূর্য কেন ওঠে, সাগরের পানিতে লবণ কেন, চাঁদ-সূর্য গ্রহণ লাগে কেন, আকাশ কেন নীল হয় ইত্যাদি কঠিন তত্ত্বভিত্তিক প্রশ্ন করেন। বাবু মশাই এ বিষয়গুলােকেই জ্ঞানের সর্বোৎকৃষ্ট বলে মনে করেন। কিন্তু তিনি এ বিষয়টি মাথায় রাখতে পারেন নি যে, এ বিষয়গুলাে মহাবিশ্বের জ্ঞানের মধ্যে একটা অংশমাত্র। মাঝি একজন অশিক্ষিত লােক বলে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তার অল্প। বাবু মশাই সেটা জেনেও মাঝিকে এ জাতীয় প্রশ্ন করে বিড়ম্বনায় ফেলে দেন। এটি বাবু মশাইয়ের নীচু মানসিকতারই পরিচয় বহন করে। তিনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অহংকারে অন্ধ হয়ে মাঝির অর্জিত জ্ঞানকে তাচ্ছিল্য করতে থাকেন।

এক পর্যায়ে তিনি মাঝিকে মূর্খ বলেন এবং তার জীবনটা বারাে আনাই বৃথা বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাগরে প্রচণ্ড ঝড় ওঠে। নৌকা ঝড়ের প্রচণ্ড আঘাতে দুলতে থাকে। বাবু মশাই প্রাণভয়ে কাপতে থাকে। মাঝি তখন প্রশ্ন করেন যে, তিনি সাঁতার জানেন কিনা। তিনি মাথা নেড়ে না সূচক উত্তর দেন। তখন মাঝি প্রতিশােধমূলকভাবে বাবু মশাইয়ের জীবন ষােলাে আনাই মিছে বলে। মাঝির এই উক্তি বাবু মশাইয়ের প্রতি লেখকেরই উক্তি। লেখক এই সাধারণ কথার মধ্য দিয়ে বাঙালি চরিত্রের এক গভীর জীবন দর্শন তুলে ধরেছেন।

লেখক বলেছেন, আমাদের সমাজে এক শ্রেণির শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন যারা নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবেন। তার চেয়ে জ্ঞানী মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই বলে মনে করেন। জ্ঞানের অহংকারে তারা সমাজের নীচু শ্রেণির মানুষদের মানুষই মনে করেন না। তারা ভুলে যান ক্ষেত্রবিশেষ এমন কিছু পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যেখানে প্রথাগত বই পুস্তকের জ্ঞানের চেয়ে হাতে-কলমের প্রশিক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি কাজে লাগে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায়ও দেখা যায় রাজ্যের ধুলা দূর করতে মন্ত্রী, পণ্ডিত কত কিছু করেছিলেন কিন্তু সামান্য এক চর্মকার রাজার পায়ে চামড়ার জুতা তৈরি করে দিয়ে পরিস্থিতির সুন্দর সমাধান দেন। এজন্য সমাজের ছােট ও নীচু শ্রেণির মানুষদের দ্বারাও অনেক কাজ হয় এই ভাব ভুলে গেলে আমাদের চলবেনা। তাদেরকে মূল্যায়ন করা শিখতে হবে। যথার্থ শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দিতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে। কথাটিই সুকুমার রায় আলােচ্য ছড়ায় বুঝাতে চেয়েছেন মাঝি আর বাবু মশাইয়ের কথার মধ্য দিয়ে।

২. সুকুমার রায়ের ষোলাে আনাই মিছে কবিতার মূলভাব আলােচনা করুন।

সুকুমার রায়ের এই কবিতায় দেখা যায় একজন বিদ্যে বােঝাই বাবু মশাই নৌকায় চড়ে বসেন। সেখানে মাঝির সাথে তার কথােপকথন হয়। মুলত মাঝি ও তার কথোপকথনকে কেন্দ্র করে এই কবিতা বা ছড়া।বাবু মশাই একজন বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী মানুষ। সূর্য কেন ওঠে, জোয়ার কেন আসে, সাগরের পানিতে লবণ কেন, আকাশ নীল দেখায় কেন, সূর্য-চাঁদে গ্রহণ লাগার কারণ ইত্যাকার কঠিন জ্ঞান তিনি আয়ত্বে এনেছেন।

তবে মহাবিশ্বের সমগ্র জ্ঞানরাজির মধ্যে যুক্তিবাদ বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান একটা অংশ। বাবু মশাই এই বিষয়টি মাথায় রাখতে পারেন নি। তিনি তার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা যুক্তিবাদের জ্ঞানকেই সর্বোধকৃষ্ট মনে করেন। মাঝি একজন অশিক্ষিতি লােক বলে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তার অল্প। বাবু মশাই সেটা জেনেও মাঝিকে প্রশ্ন করে বিব্রত করেন। এখানে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানযুক্ত বাবু মশাইয়ের নিচু মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তার অর্জিত জ্ঞানের  অহংকারে অন্ধ হয়ে, মাঝির অর্জিত জ্ঞানকে  তাচ্ছিল্য করে প্রশ্ন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে মাঝিকে মূর্খ বলেন। এবং বলেন তার জীবন বারো আনাই মিছে। এরপর ঝড় ওঠে। নৌকা দুলতে থাকে বাবু মশাই ভীত হন। মাঝি তখন বাবু মশাইকে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি সাতার জানেন কি না। তিনি না সূচক উত্তর দেন তখন মাঝি প্রতিশােধমূলকভাবে বাবু মশাইয়ের জীবন যে ষােলো আনাই মাটি তাও বলে।

মাঝির এই উক্তি বাবু মশাইয়ের প্রতি লেখকেরই উক্তি। লেখক এর মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তার জীবনকে পূর্ণতা দিতে পারেনি। সুকুমার রায় এখানে বৈজ্ঞানিক জান, মুক্তিবাদই যে সকল জ্ঞানের মূলমন্ত্র নয় সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন।

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.