পাঠ- ৭.০: প্রবন্ধের স্বরূপ, শ্রেণিবিভাগ ও তাৎপর্য
১. প্রবন্ধ বলতে কী বুঝায়?
প্রবন্ধ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছ। প্রবন্ধ হচ্ছে কথাসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্রবন্ধ শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় ‘প্র+বন্ধ’। প্র অর্থ এখানেপ্রকৃষ্ট। বন্ধ’ অর্থ বন্ধন। অর্থাৎ প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন বা বাঁধা। কোনাে বিষয় সম্পর্কে লেখকের বক্তব্যকে যুক্তি, তর্ক, তত্ত্ব, তথ্য দৃষ্টান্ত, প্রয়ােজনীয় উদ্ধৃতি সহযােগে বিভিনড়ব দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামাের মধ্যে প্রকৃষ্টরূপে উপস্থাপনের নামই প্রবন্ধ। প্রবন্ধে সাধারণত কোনাে বিষয় সম্পর্কে লেখক তার নিজস্ব ভাবনার প্রকাশ ঘটান। প্রবন্ধকে সাধারণভাবে রচনা বলা হয়ে থাকে।
বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ শব্দটির অনেকগুলাে প্রতিশব্দ আছে যেমন সংগ্রহ, সন্দর্ভ, রচনা ইত্যাদি। সাহিত্যে প্রবন্ধের উৎপত্তিই ঘটেছে চিন্তা এবং যুক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। প্রতিটি প্রবন্ধ সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক।
যথেষ্ট প্রমাণ, উপযুক্ত তথ্য-তত্ত্ব প্রয়ােগ করে ভাষার চিন্তায় সেই বিষয়ের প্রতিষ্ঠা করাই হলাে প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম শাখা। কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে লেখক কোনাে বিষয় সম্বন্ধে সচেতনভাবে যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য সৃষ্টি করেন তাকেই প্রবন্ধ বলে।
কোনাে বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিমূলক গদ্যরীতির সাহিত্যিক সৃষ্টিকে প্রবন্ধ বলা হয়। যেকোনো বিষয় অবলম্বনে মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিপূর্ণ ও সুচিন্তিত গদ্য রচনাকে প্রবন্ধ বলে।
সাধারণত কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করে লেখক কোনাে বিষয় নিয়ে আত্মসচেতন, যুক্তিসিদ্ধ, যথাযথ বাক্য বন্ধনে আবদ্ধ যে সাহিত্য রূপ সৃষ্টি করেন, তাকে প্রবন্ধ বলা হয়।
প্রবন্ধের সংজ্ঞা:
“কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় করিয়া লেখক কোন বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতনতামূলক নাতিদীর্ঘ সাহিত্যরূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলা হয়। প্রবন্ধের ভাষা ও দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে বৈচিত্র্য থাকিলেও ইহা সাধারণত গদ্যে এবং নাতিদীর্ঘ করিয়া লিখিতে হইবে। কোন তত্ত্ব, তথ্য বা চিন্তাকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে আদি মধ্য অন্তভাবে বিন্যস্থ করে প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়।
সাহিত্য সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাসের ভাষায় সাধারণত: কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় করিয়া লেখক কোন বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতন নাতিদীর্ঘ সাহিত্যরূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলা হয়”। “অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবন্ধ ব্যাখ্যা করেন ‘চিন্তামূলক তথ্যবহুল গদ্য রচনা হিসাবে।
২. প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য লিখুন।
প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:
* মূলত গদ্যরীতিতে রচিত,
* সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক,
* আত্মসচেতনতা,
* প্রমাণক তত্ত্ব-তথ্য সংবলিত > চিন্তার সুশৃঙ্খলতা,
* যৌক্তিক উপস্থাপনা,
* ভাষার প্রাঞ্জলতা (প্রবন্ধের ভাষা হবে সহজ সরল। যার অর্থ সহজবোধ্যতা। অর্থাৎ লেখকের বক্তব্যের বিষয় পাঠক পড়ামাত্র বুঝতে পারলে তাকে ‘প্রাঞ্চলতা’ বলে।প্রবন্ধ হবে নাতিদীর্ঘ অর্থাৎ আকৃতির দিক থেকে প্রবন্ধ যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হবে। তবে প্রতিপাদ্য বিষয়ের ব্যাপকতারকারণে দীর্ঘ হতে পারে।) যে কোন বিষয়বস্তু প্রবন্ধের উপজীব্য হতে পারে।
* মননশীলতা প্রবন্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। (মননশীল: বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তায় অভ্যস্ত বুদ্ধিদীপ্ত বিচার শক্তি সম্পন্ন।লেখকের যৌক্তিক চিন্তা বা বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার প্রতিফলন।
* নৈর্ব্যক্তিকতা প্রবন্ধে থাকা বাঞ্ছনীয় (নৈর্ব্যক্তিকতা বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা,ব্যক্তি নিরপেক্ষ)।
৩. প্রবন্ধের প্রকারভেদ বা বৈচিত্র্যতা উল্লেখ করুন।
প্রবন্ধের প্রকারভেদ বা বৈচিত্র্য:
বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে প্রবন্ধকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
(ক) বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ এবং
(খ) ব্যক্তিগত প্রবন্ধ।
(ক) বস্তুনিষ্ঠ বা তন্ময় প্রবন্ধ:
যে প্রবন্ধে বিষয়বস্তুর প্রাধান্য থাকে তাকেই তনুয় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলে। বিষয়বস্তুর প্রাধান্য বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের মূল বৈশিষ্ট্য। ইংরেজিতে বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের Impersonal Prose, Formal Essay, Discourse ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধে পাঠশেষে বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রয়ােগ করে পাঠক কোনাে বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি বিকাশের সুযােগ পায়। শ্রীশচন্দ্র দাশের মতে, বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ আমাদের বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণতর, দৃষ্টিকে সমুজ্জ্বল ও জ্ঞানের পরিধিকে প্রশস্ত করে তােলে। অনাদিকে যুক্তি, উপাত্ত, প্রমাণ দ্বারা কোনাে বিষয়ের প্রতিষ্ঠাই বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের লক্ষ্য। অর্থাৎ যুক্তিতর্কের বাইরে লেখকের নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের সুযােগ বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধে নেই। যেমন- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাঙ্গালার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শব্দতত্ত্ব ইত্যাদি। তন্ময় প্রবন্ধ অনেকরকম হয় যেমন:
১. বিবৃতিমূলক প্রবন্ধ (কাহিনীর বিবরণ বিস্তৃত থাকে)।
২. ব্যাখ্যামূলক (মত ও তত্ত্ব আলােচনা এই প্রবন্ধের আসল উদ্দেশ্য)।
৩. বর্ণনামূলক (বিষয় বস্তুর বর্ণনা পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়ে থাকে)।
৪. বিতর্কমূলক (মতবাদের বিশ্লেষণ এবং পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি)।
৫. চিন্তামূলক: (বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়ের পরিচিতি নির্ণয়।
৬. তথ্যমূলক (বিবিধ তথ্যের মাধ্যমে রচিত প্রবন্ধ)।
৭. নীতি কথামূলক (প্রচলিত নীতিকথা এতে স্থান পায়)।
বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের কতগুলাে বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যা নিম্নরূপ :
১। তত্ত্ব, তথ্য ও বস্তুভার,
২। বিষয়বস্তুর প্রাধান্য,
৩। যুক্তি তর্কসংবলিত,
৪। প্রমাণনির্ভর,
৫। তত্ত্বকথা বা সমস্যার আলােচনার প্রাধান্য।
(খ ) ব্যক্তিগত বা মন্ময় প্রবন্ধ:
যে প্রবন্ধে ব্যক্তি হৃদয়ের প্রাধান্য থাকে তাকে ব্যাক্তিগত বা মন্ময় প্রবন্ধ বলে। মন্ময় বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধ জ্ঞানের বিষয়কে হাস্যরসমন্ডিত বা কোমলতা দান করে উপস্থাপন করা হয়। ব্যক্তিগত প্রবন্ধকে Essay Literature, Personal Essay, Informal Essay ইত্যাদি নামে অভিহিত করা যেতে পারে। ব্যক্তিহৃদয়ের প্রাধান্য ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের মূল বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ যুক্তি, তর্ক, তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণাদি ইত্যাদির তুলনায় ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধে ব্যক্তি হৃদয়ের যুক্তি ও আবেগ, অনুভূতি, সৌন্দর্যবােধ ইত্যাদি বিষয় গুরত্ব পায়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ সাহিত্যের বিভিনড়ব রূপ (Form), অর্থাৎ গল্প, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদির সমতুল্য।
ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ পাঠশেষে পাঠক লেখকের উপস্থাপিত বিষয়ের আবেগ, সৌন্দর্য ইত্যাদির সাথে একাত্মবোধ করেন এবং সৃষ্ট সৌন্দর্যের রস-আস্বাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “ব্যক্তিগত প্রবন্ধে যুক্তিতর্কের বাঁধুনির চেয়ে একটি মনের বিশেষ মুহূর্তের মুড বা মেজাজ অধিকতর উপভােগ্য হয়। জীবনচরিত, আত্মচরিত, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত ইত্যাদি ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’ ইত্যাদি তার প্রমাণ।
ব্যক্তিগত প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য:
১। ভাব প্রধান,
২। বিষয়বস্তু ব্যক্তি হৃদয়ের রসসিঞ্চিত,
৩। নাতিদীর্ঘ থেকে বৃহদাকার অবয়ববিশিষ্ট,
৪। বিভিন্ন সাহিত্য রূপ এর তুল্য (জীবনচরিত, আত্মচরিত, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত ইত্যাদি)
৫। নৈর্ব্যক্তিক প্রামাণ্য চেয়ে ব্যক্তিগত চিন্তার যুক্তি ও সৌন্দর্য-দৃষ্টিসম্পন্ন প্রবন্ধ বলে।
৩) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের পরিচয় এবং এর ধারা বর্ননা করুন।
৪. বাংলা প্রবন্ধের পরিচয় ও এর বিভিন্ন ধারাসমূহের বর্ণনা দিন।
বাংলা প্রবন্ধের পরিচয়:
বাংলা প্রবন্ধের সূচনা ধর্মীয় বাক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে। উনিশ শতকের শুরুতে খ্রিষ্টান মিশনারীরা এদেশে ধর্ম ও শিক্ষা প্রচারে ব্রতী হলে তারা বাইবেল অনুবাদ, বাইবেলের মাহাত্মাসূচক নিবন্ধ, প্রচারপত্র ও পাঠ্যপুস্তক রচনায় হাত দেন। এ কাজে তারা গদ্য ব্যবহার করেন। ফলে বাংলা গদ্য যেমন বিকাশ লাভ করে তেমনি বাংলা প্রবন্ধও গড়ে ওঠে। এ কাজে শ্ৰীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান অনীকার্য। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা গদ্য চর্চায় রত হয়। তারা গদ্যে বাংলা পাঠ্যপুস্তকে, ব্যাকরণ, ইতিহাস, উপকথা রচনা করেন। ফলে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য গড়ে ওঠে। রাজা রামমোহন রায়ও এ সময় প্রবন্ধ নিবন্ধ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে বেদান্ত সূত্র, বেদান্তসার, প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে ঋদ্ধ করে তোলেন।
বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের ধারা:
বাংলার প্রবন্ধ সাহিত্যকে ৩ টি পর্যায়ে বিভাজিত করে আলোচনা করা যেতে পারে। যথা:
১. উন্মেষ পর্ব,
২. বিকাশ পর্ব এবং
৩. বাংলাদেশ পর্ব।
১. উন্মেষ পর্ব:
উনিশ শতকের শুরুতে গদ্যের সুত্রপাতের সাথে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের সূচনা সম্পর্কিত। এ সময় সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম নানা বিষয়ে চর্চা শুরু করেন। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য মূলত ঐ চিন্তন প্রক্রিয়ার লিখিত রূপের ফল । বিশেষত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, অর্থাৎ উইলিয়াম কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যনঞ্জয় বিদ্যালংকারের হাতে প্রবন্ধের গোড়াপত্তন ঘটে। তবে এ সময়ের রচনায় প্রবন্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অনেকাংশ অনুপস্থিত এবং প্রধানত দেশি-বিদেশি উপকথার অনুবাদ, ঐতিহাসিক কাহিনী, পাঠ্যপুস্তক, ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীকালে রাজা রামমোহন রায়ের উপযুক্ত ভাষাশৈলী ও যুক্তিনিষ্ঠ রচনাসমূহের মধ্যে প্রবন্ধ সাহিত্যের শৈল্পিক জোয়ার লক্ষ্য করা যায়। সমকালীন সাময়িক পত্রসমূহে সমাজ ও ধর্মবিষয়ক বিচিত্র বিষয়ের অবতারণাও প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভূদেব মুখোেপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ প্রবন্ধ সাহিত্যের উন্মেষে বিশেষ অবদান রাখেন।
২. বিকাশ পর্ব:
প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বিষয় বৈচিত্র্য। বিকাশ পর্বে অসংখ্য সৃজনশীল প্রাবন্ধিকের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ে প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশ সাধিত হয়। উপন্যাসিক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত জাতীয় জীবন ও সংস্কৃতি বিষয়ক অসংখ্য প্রবন্ধ এ ধারায় উৎকর্ষ অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এ-পর্বের অন্যান্য প্রাবন্ধিকের মধ্যে কালীপ্রসন্ন ঘােষ, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, মীর মােশাররফ হােসেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোেগ্য। এ-সময়ে রচিত অধিকাংশ প্রবন্ধই কনিষ্ঠ প্রবন্ধের পর্যায়ভুক্ত। পরবর্তীকালে সাহিত্যের অন্যান্য ধারার মতই প্রবন্ধ সাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনী স্পর্শে শৈল্পিকতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে।
৩. বাংলাদেশের প্রবন্ধ:
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকে বর্তমান বাংলাদেশের পরিসীমায় রচিত প্রবন্ধ সাহিত্য বিষয় ও আঙ্গিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এ অঞ্চলের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলিম সমাজের জন্য পথনির্দেশের প্রয়ােজনে বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য এই ভিন্ন মাত্রিক নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সঙ্গত কারণেই ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যের বিষয়।
বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যকে দুই পর্বে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা:
১. মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী প্রবন্ধ এবং ২. মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রবন্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী প্রাবন্ধিকদের মধ্যে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মােতাহার হোসেন, আব্দুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পাঠ-৭.১: কাবুল যাত্রা (সৈয়দ মুজতবা আলী)
১. দেশে-বিদেশে প্রবন্ধটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরুন।
দেশে বিদেশে হচ্ছে কথা-সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত একটি ভ্রমণ কাহিনী।শান্তিনিকেতনে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আফগানিস্তান সরকারের অনুরােধে “কাবুল কৃষি কলেজে” ফার্সি এবং ইংরেজী ভাষার শিক্ষক হিসেবে যােগদান করেন। “দেশে বিদেশে” ভ্রমন কাহিনীটি শুরু হয় তার কোলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। এই বইটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়; অন্য কোন ভ্রমণ কাহিনী আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে এর মতাে এতােটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। একটি ভ্রমণ কাহিনী হওয়া স্বত্ত্বেও এটি আফগানিস্তানের লিখিত ইতিহাসের একটি অনবদ্য দলিল।লেখকের রম্য রসাত্মক বর্ণনা, বিভিন্ন পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষের সাথে রসালাপ, ভ্রমণের সময় বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা এবং শেষ পর্যায়ে এসে আফগানিস্তান ছেড়ে আসার করুন কাহিনী অসাধারনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই ভ্রমণ কাহিনী।
দুই খন্ডে প্রকাশিত দেশে বিদেশের প্রথম খন্ড হচ্ছে কলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাত্রার এক চমৎকার বিবরণ। ভ্রমনকারীর ভঙ্গিতে লেখক সেখানে তুলে ধরেছেন তার যাত্রাপথের সঙ্গী বিচিত্র সব চরিত্র। চলার পথে তিনি যেসব এলাকা অতিক্রম করে সেসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য, পােশাক-আশাক, সংস্কৃতি, কৌতুকবােধ কোনাে কিছুই তার সরস কলমে বাদ পড়েনি। শুরু হয়েছে কলকাতার ফিরিঙ্গি সহযাত্রীকে নিয়ে। পরে তা বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও পেশােয়ারের পথের শিখ সর্দারজি ও পাঠান সহযাত্রীদের কথা। দ্বিতীয় খন্ড অন্যরকম। প্রথম খন্ড পড়ে যারা ধারণা করবেন দেশে-বিদেশে হচ্ছে একটি ত্রমণকাহিনি, দ্বিতীয় খন্ড পড়ে তাদের হোঁচট খেতে হবে। সেখানে কোনাে ভ্রমণবৃত্তান্ত নেই। আছে লেখকের নতুন কর্মস্থল আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা। সেখানকার প্রগতিশীল শাসক আমানুল্লাহর আধুনিক আফগানিস্তান গঠনের স্বপ্ন, মােল্লাতন্ত্রের বিরোধিতা, প্রতিবিপ্লবে আমানুল্লার পতন তথা আফগানিস্তানের উত্থান-পতনের বিবরণ। তিনি কাবুলে মানুষের সহজ সরল জীবনযাত্রা, চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়ায় যে ঐতিহ্য সব কিছুই নিপুণ শিল্পীর মতাে তুলে ধরেছেন।
২. কাবুল যাত্রার মূলভাব বর্ণনা করুন।
পাঠের অংশটুকু সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে-বিদেশে’ নামক রচনার ৭ম পরিচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে। প্রচুর শ্রেণি-প্রকৃতি নিয়ে মতবিরােধ থাকলেও সাধারণভাবে এটিকে ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে দেশে-বিদেশে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাংলা ভাষায় দেশভ্রমণকে অবলম্বন করে রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্যে দেশে-বিদেশে অন্যতম সেরা রসসৃষ্টি। লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি, প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণের অসাধারণ দক্ষতা, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে বিশেষ কৌতূহল এবং সর্বোপরি বর্ণনার রসগ্রাহিতা এই রচনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। এসব বিবেচনায় দেশে বিদেশে সাধারণ ভ্রমণ-কাহিনির তুলনায় অসাধারণ সাহিত্যে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের সূক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং শিল্পোত্তীর্ণ পরিবেশনায় এটি বিশেষ স্থানের প্রামাণিক দলিলে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অংশটুকু সম্পর্কে উপর্যুক্ত মতামত সর্বাংশে প্রয়ােগযােগ্য। এ কারণে দেশে-বিদেশে ভ্রমণকাহিনি হলেও তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রের আর্থ সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাঠে লেখকের পেশাওয়ার থেকে বাসে কাবুল ভ্রমণের অংশটুকু বিবৃত হয়েছে। জনৈক পাঠান আহমেদ আলীর গৃহে এক সপ্তাহের আতিথ্য গ্রহণ শেষে লেখক বাসে কাবুল যাত্রা করেন। পথে খাইবারপাস সড়কের বর্ণনা, প্রসঙ্গক্রমে আফগান আইনি পরিস্থিতি, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রসঙ্গ অবতারণা লেখকের বর্ণনাকে পাঠকের কাছে তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রের একটি সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরে। সর্বোপরি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের তীক্ষ দৃষ্টি এবং প্রকাশের দক্ষতায় রুক্ষ পথের বর্ণনাতেও পাঠক রসের সন্ধান পান। চলিত রীতিতে ক্রিয়া ও সর্বনামপদ অক্ষুন্ন রেখেও তিনি অবাধে আরবি-ফারসি-আঞ্চলিক ইংরেজি শব্দের প্রয়ােগ করে বর্ণনাকে একদিকে যেমন শুতিমধুর করেছেন, অন্যদিকে নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র স্টাইল। ফলে পাঠককে বর্ণনার মাধ্যমে চিত্রকল্প তৈরি করে নিতে বেগ পেতে হয় না।
৩. কাবুল যাত্রায় লেখকের ভ্রমনবৃত্তান্ত বর্ণনা করুন।
সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯২৭ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আফগানিস্তান সরকারের অনুরােধে কাবুল কৃষি কলেজে ফারসি এবং ইংরেজী ভাষার শিক্ষক হিসেবে যােগদানের উদ্দেশ্যে কাবুল যাত্রা করেন। লেখক কলকাতা থেকে পেশাওয়ার হয়ে কাবুল যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ভ্রমনের আগের দিনের তাপমাত্রা ছিল ১১৪ ডিগ্রী। কাবুলের উদ্দেশ্যে লেখক একাকী একটি বাসে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সাথে বাসে ড্রাইভার শিখ সর্দারজি কাবুল বেতার কেন্দ্রের একজন সরকারী কর্মচারী এবং কাবুলের একদল ব্যবসায়ীর সাথে আলাপচারিতা হয়। যেহেতু তাপমাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি সেজন্য ভ্রমনটা সুখকর ছিলনা। কাবুল বেতারের সরকারী কর্মচারী নিজেকে সবভাষায় তার দখল আছে বলে দাবী করলেও আসলে এক ফারসী ছাড়া অন্য কোন ভাষা তিনি জানেন না। লেখক ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারেন আফগান শিল্প মাত্র ৩ টি বস্তু প্রস্তুত করেন, বন্দুক গােলাগুলি এবং শীতের কাপড়। আর বাদবাকী সবকিছুই আমদানী করতে হয়। যাত্রাপথে লেখক পর্যবেক্ষন করলেন কোন কিছু ঝলসে গেলে যা হয় দেশটির অবস্থাও ঠিক তাই। কোথাও কোন সবুজের ছায়া নাই। একসময় লেখক খাইবার গিরিপথ প্রবেশ করেন। খাইবার গিরিপথের বর্ননা অত্যন্ত চমৎকার ভাবে বর্ননা করেছেন। দুদিকে হাজারফুট উচু পাথরের নেড়া পাহাড়। মাঝখানে খাইবারপাস। একজোড়া রাস্তা একে বেকে অন্যের গা ঘেঁষে চলেছে কাবুলের দিকে যেকোন জায়গায় দাড়ালে চোখে পড়ে ডানে-বামে, সামনে পিছনে পাহাড় আর পাহাড়। এখানে সূর্য যেন নেমে এসেছে। সূর্যের প্রচণ্ড তাপে হঠাৎ বাসের টায়ার ফেটে যায়। এসময় সরদারজী বাসের যাত্রীদের বললেন বাস থেকে না নামতে কারন খাইবার পাসের রাস্তা সরকারের হলেও দুপাশের জমি পাঠানদের। সেখানে নেমেছ কি মরেছ। প্রায় আধাঘন্টার পর টায়ার ঠিক হল কিন্তু লেখকের কাছে মনে হয়েছে দুঘন্টা কারন প্রচন্ড গরমে তিনি নাজেহাল হয়ে পড়েছিলেন। অতপর বর্ডার ক্রস করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করলেন। খাইবার গিরিপথের রাস্তাটি ছিল পিচঢালা কিন্তু আফগানিস্তানে প্রবেশ করে দেখলেন রাস্তার অবস্থা ভয়ানক খারাপ ফলে যাত্রাটিও অনেক পীড়াদায়ক ছিল। এসময় লেখক পর্যবেক্ষন করলেন যেদিকে চোখ যায় শুধু নুড়ি আর নুড়ি যেখানে নুড়ি নাই সেখানে আবছায়া পাহাড়। এভাবে চলতে চলতে একসময় দক্কার কাছে পৌছালেন। দক্কার সামনে বাম পাশে লক্ষ্য করলেন কাবুল নদীর পানি ছলছল করে বয়ে চলছে তার ডান দিকে এক ফালি সবুজ আচল লুটিয়ে পড়েছে। এ দেখে লেখক একধরনে প্রশান্তি অনুভব করলেন। এ প্রবন্ধে লেখক তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। রচনায় তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার অসাধারন দক্ষতা,সাধারন মানুষ সম্পর্কে বিশেষ কৌতুহল এবং সর্বোপরি বর্ণনার রস গ্রহিতা এই প্রবন্ধটিকে ভিন্নমাত্রা দান করেছে।
৪. খাইবারগিরি পথের বর্ণনা দিন।
খাইবার গিরিপথ পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে অবস্থিত । খাইবার গিরিপথ (উচ্চতাঃ ১,০৭০ মিটার অথবা ৩,৫১০ ফুট) একটি পার্বত্য গিরিপথ। এটি স্পিন ঘার পর্বতের উত্তরাংশকে ছেদ করে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। এটি প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো এবং এটি পৃথিবীতে ব্যবহৃত প্রাচীনতম গিরিপথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতিহাস থেকে জানা যায় এটি মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিলো। এই গিরিপথের সীমানা পাকিস্তানের ৫ কিলোমিটার (৩.১ মাইল) ভেতরে লান্ডি কোটাল পর্যন্ত।
গিরি মানে হল পাহাড়, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। গিরিপথ হলো পর্বত প্রণালী বা পর্বতের ঢালে অবস্থিত সড়ক পথ। গিরিপথ অনেকক্ষেত্রে শুধু মানুষের গমনযােগ্য হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষ যানবাহন উভয়েই চলতে পারে। পৃথিবীর অনেক পর্বতমালা মানুষের যাতায়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, তাই এসব ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরে গিরিপথ মানুষের চলাচলে সাহায্য করেছে। গিরিপথ সাধারণত পর্বতের নিচু অংশ, ধার দিয়ে নির্মিত হয়। দুই পর্বতের মধ্যবর্তী অংশ দিয়ে সাধারণত গিরিপথ হয়। খাইবার গিরিপথ হল পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংযােগ রাস্তা/পথ/বাইপাস । এটি একটি প্যাঁচানাে রাস্তা যার পর্বতের উত্তরাংশকে ছেদ করে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। এই গিরিপথের দৈর্ঘ্য ৫৬ কিলোমিটার।
পাঠ-৭.২: সুবেহ সাদেক (বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন)
১. সুবেহ সাদেক প্রবন্ধের মূল বক্তব্য আলোচনা করুন।
বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) বাঙালি নারীদের বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাঁর সুবহে সাদেক প্রবন্ধে যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি বাস্তালি নারীদের পশ্চাৎপদভার কর এবং তা থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন। সুবহে সাদেক লেখকের অন্যধর্মী একটি জাগরণমূলক প্রবন্ধ। লেখক তার প্রবন্ধে অজান্ত সিদ্ধহস্ত লেখকের মতে নানা ব্যঞ্জনধর্মী শব্দ প্রয়ােগের মাধ্যমে আমাদের নারী জাতিকে সমস্ত কুসংস্কার, দাসিবৃত্তিপনা প্চাব অন্গ্রসরতা পেছনে ফেলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জেগে উঠে সামনের দিকে যাওয়ার জন্য এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
সুবহে সাদেক কথাটির অর্থ হলাে ভাের বা প্রত্যুষ। প্রত্যুষ একটি দিনের সূচনা নির্দেশক। দিনের শুরুতে যেমন, পূর্বাকাশে সুর্য উঠে রাতের অন্ধকার কেটে যায় এবং মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি শুনে মুসলমান নর-নারী জেগে ওঠে এবং সমস্ত দিন কাজকর্মে নিজেদের ব্যস্ত রাখে ঠিক তেমনি রােক্সেয়া বাঙালি নির্বোধ, অবুঝ ললনাদের দাসিবৃত্তি পরিহার করে জেগে উঠতে বলেছেন। লেখক মনে করেন প্রত্যুষের মতােই নারী জাতির জন্য নতুন একটি যুগের সূত্রপাত হয়েছে। মানুষ যেমন রাতের অন্ধকার পেছনে ফেলে দিনের আলােয় সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে পা বাড়ায় তেমনি এই নতুন দিনের সূচনালগ্নে নারী জাতির আহ্বান এই প্রবন্ধে বার বার সমস্বরে উচ্চারিত হয়েছে। গৃহ কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি জীবন না কাটিয়ে শয্যা ত্যাগ করে এবং সামাজিক সকল প্রকার অত্যাচার, অনাচার, উৎপীড়ন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আহ্বান ধ্নিত হয়েছে আলােচ্য প্রবন্ধে।
প্রাবন্ধিক বিশ্বাস করেন নারীরা একবার জেগে উঠলে কেউ তাদের অবদমিত করে রাখতে পারবে না। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন, প্রথমে নারীকেই বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ অংশের অর্ধেক। প্রবন্ধে ঘরের চার দেয়ালের অবরুদ্ধ মুসলমান নারী সমাজের অধােগতির কারণ, জাগরণের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সমাধানের উপায় সম্পর্কে বাস্তবডিত্তিক আলােচনা করা হয়েছে। কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন নারী জাতির অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধান করে বলেন, তারা নিজেদের জন্য যাবতীয় অভিসম্পাত বিরাজ করে রেখেছেন, তারা সময়ের গতির সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হন না। অজ্ঞ ও মুর্থ বাজির মতাে অন্যায় বিচারের প্রতিবাদ করেন না; চারদিকে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সকল ধরনের অন্যায়-অত্যাচার কাঠের পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়ে সহ্য করে যান। নারীরা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট নন। তাদের মনে রাখতে হবে কেউ কারো অধিকার হাতে তুলে দেয় না। নিজের প্রাপ্য অধিকারটুকু নিজেকেই ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাবতে লজ্জা হয়; পুরুষেরা তাদেরকে দামিরূপে, অলংকারস্বরূপ মনে করেন কিং পশু তুল্য চাবলেও তাদের বােধােদয় হয় না বরং তারা গৌরববােধ করেন। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমান নারী সমাজে প্রচলিত প্রথা নারীকে কীভাবে মানসিক দাসত্ব দান করেছেন এবং সমাজের সার্বিক মঙ্গল ও উন্নতিতে মুসলমান নারীরা কী ভূমিকা পালন করতে পারে ইত্যাদি প্রসঙ্গে রােকেয়ার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ এই প্রবন্ধে বিবৃত হয়েছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ‘সুবহে সাদেক বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
প্রায় শতবর্ষ পূর্বে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও কালের সীমা অতিক্রম করে বর্তমান বাংলাদেশ এটি সমানভাবে সমাদৃত। নারী মুক্তি কিংবা নারীর ক্ষমতায়নের সােপানগুলাে সম্পর্কে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অবগত। নিঃসন্দেহে এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়। রোকেয়া যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষা বিস্তার ব্যতীত এ অবস্থার পরিবর্তন কিংবা নারী উন্নয়নের চিন্তা বাতুলতা মাত্র। এই শিক্ষার স্বরূপ মানবিক ও শারীরিক হওয়া উচিৎ।
২. রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন তাঁর সুবেহ সাদেক প্রবন্ধে মুসলমান নারীদের অনগ্রসতার কী কী কারণ চিহ্নিত করেছেন? এই অবস্থার পরিবর্তন কিভাবে করা যায়-বিশ্লেষণ করুন।
অথবা, ঔপনিবেশিক আমলে বঙ্গনারী সমাজের অবস্থা কেমন ছিল ব্যাখ্যা করুন।
বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার সুবেহ সাদেক প্রবন্ধে বাংলার মুসলিম নারী র পশ্চাৎপদতার মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন এবং তা থেকে সমাধানের পথ নির্দেশ করেছেন। যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের আলােকে সমগ্র ভারতবর্ষের নারীকে আলাের পথ দেখিয়েছেন।
নেত্রী সমাজের অনগ্রসরতার কারণ :
রােকেয়া বলেছেন, বাংলার মুসলিম নারীরা মানসিক দাসত্বে বন্দি। জন্মাবধি পুরুষের দাসত্ব মেনে চলতে চলতে তারা নিজেদের পুরুষের দাসী মনে করে। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘আমরা জন্মিয়াছি দাসী চিরকাল দাসী, যাকবি দাসী, তার মানসিক দাসতুই নারীদের সমাজে পিছিয়ে রেখেছে।
নারী সমাজের অনগ্রসর অন্যতম কারণ হলাে নারী শিক্ষার অভাব। পুরুষ শাসিত সামজে নারীদের বান্তবভিত্তিক শিক্ষা-দীক্ষা। বাইরের আলাে-বাতাস ও তাদের জ্ঞান অনুশীলনীর চর্চা থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। নারীদের পুরুষেরা গৃহ কারাগারে অন্ধকার
স্যাতসেতে মেঝেতে আটকে রেখেছিল।পুরুষ সমাজ কথনােই নারী সমাজের প্রতি প্রদ্ধাশীল নয়, বরং নারীদেকে তারা নানাভাবে উপক্ষো করে। নারীদের অবলা, নাকেসুল আকেল বলে দুনিয়ার সমস্ত দেশ তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়। নারীদের প্রতি পশুর ন্যায় পুরুষের ব্যবহার করে। আর নারীরা এতে গৌরববােধ করে।পুরুষেরা নারীদের ভােগের সামগ্রী মনে করে। পুরুষরা নারীদের মূল্যবান অলংকারের শামিল মনে করে।
ধর্মীয় বিধনে নারীদেরকে পুরুষের অর্ধেক হিসেবে দেখানাে হয়েছে। ফলে ধর্মের দােহাই দিয়ে পুরুষেরা নারীদেরকে ব্যবহার কে। নারীকে যে পুতুল হিসেবে খেলা করতে ভালােবাসে। নারীদেরকে তারা হাতের ক্রড়ানকে পরিণত করেছিল। নারী সমাজের গতির পক্ষে লেখকাে মতামত দেশের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকে অণ করতে হবে। রোকেয়া মনে করেন, একটি গাড়ির যেমন দুটি চাকা খাকে এবং দুটি চাকার সাহায্যে গাড়িটি সুন্দর চলতে পারে, তেমনি আমাদের সমাজ উন্নয়নের স্বার্থে পুইরুষের সাথে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কখনাে উন্নতি সম্ভব নয়। আাই বােজে নারী সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণগুলো চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। নিম্নে সেই পদক্ষেপগুলো তুলে ধরা হলো:
১. তিনি নারীদেরকে জেগে ওঠার আহবান জানিয়েছেন। আর এতকাল নারীরা ঘুমিয়ে থাকবে। নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে সে অধিকার আদায়ে তীব্র প্রতিবাদী হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে।
২. রােকেয়া নারীদেরকে মনের সকল কুসংস্কার, জড্তা, ভয়, লজ্জা মুছে ফেলে মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
৩. নারীর গতিকে সমাজ গতির জন্য প্রয়ােজনীয় যা যা করা দরকার তা সবই সরকারকে করতে হবে।
৪, ধর্ম প্রকৃত অর্থে নারীদেরকে যেসব অধিকার ও সম্মান দিয়েছে সমাজ ব্যবস্থায় তার সবই বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. নারীদেরকে পুরুষের অর্থ অধ্যাঙ্গী বিবেচনা করতে হবে।
৬. নারীরা যেহেতু সৃষ্টি জগতের মাতা, তাই নিজেদের দাবি-দাওয়া রক্ষার জন্য নারী সমিতি গঠন করতে হবে
৭. সর্বোপরি নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, নারী সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের যেসব পথ তিনি দেখিয়েছেন তা অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ ও বৈজ্ঞানিক তার মতে, সমাজ জীবনের অগ্রগতি ও কল্যাণ সাধনের জন্য নারী জাগরণ এবং সেই সাথে পুরুষ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিকল্প নেই।
৩. বেগম রোকেয়া নারী সমাজের অত্যাচার নিবারণের জন্য কোন ধরনের শিক্ষার কথা বলেছেন? আলােচনা করুন।
নারী সমাজের অন্যায়-অত্যাচার, অনাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন প্রভৃতির বিরুদ্ধে রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন শিক্ষা বিস্তা একমাত্র মহৌষধ বলে মনে করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্তত পক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে। তিনি শিক্ষা অর্থে প্র সুশিক্ষার কথা বলেছেন। রােকেয়া মনে করেন, গােটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দুছিত্র কবিতা লিখতে পারা শিক্ষা নয়। তিনি ম সেই শিক্ষা, যা তাদেরকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করবে, তাদেরকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং অশ মাতা রূপে গঠিত হবে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীদের মানসিক ও শারীরিক উভয় বিধ শিক্ষার কথা বলেছেন। নারীরা ইহজগতে সুদৃশ্য শাড়ি, ক্লিপ ও বহুমূল্য রত্মলংকার পরে পুতুল সাজার জন্য আসে নাই; বরং তারা জগতে বিশেষ কর্তব্য সাধন করার জন্য নারীরূপে জুলভ করেছে। তাদের জীবন শুধু পতি দেবতার মনােরঞ্জনের জন্য জন্ম হয় নি। রােকেয়া বলেছেন, নারীর যেন অন্নবস্ত্রের জন্য বরের গতহ না হয়
শারীরিক শিক্ষার জন্য তিনি বলেছেন,
লাঠি ও জুয়া খেলা, টেকির সাহায্যে ধান ভানা, জাঁতায় আটা প্রস্তুত করা এবং যাবতীয়
গৃহকর্ম শিক্ষা দেওয়া উচিত। রোকেয়া মনে করেন, এই কাজ সাধিত হলে একদিকে ধান ভানা ও
জাতা চালনায় দেশের সর্ববৃহৎ খাদ্য সমস্যা পূরণ হইবে। অন্যদিকে মানুষ চেকি ছাটা চাউল
ও জাতায় পেশা আটার অভাবে দেশের লােক মৃত্যুশ্রোতে ভেসে যাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন,
শুধু লখ্ষ-ঝম্প, নৃত্য অপেক্ষা উপরােক্ত শরীর চর্চা শতগুণ শ্রেয়। খােলা মাঠে প্রাতঃ্ভ্রমণ
অত্যন্ত বাসনীয়। সরকার এখন শিশু শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন, ভালাে কথা, কিন্তু
প্রথমে তিনি শিশুর মাতার রক্ষা করার কথা বলেছেন।
পাঠ-৭.৩: একাত্তরের চিঠি
১. ‘একাত্তরের চিঠি’ গ্রন্থের কয়েকটি চিঠির অনুসরণে মুক্তিযুদ্ধের একটি রেখাচিত্র অঙ্কন করুন।
অথবা, একাত্তরের চিঠি’র অনুসরণে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করুন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতীয় জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সে স্বাধীনতার বীজ রােপিত হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের পরিসমাপ্তি ঘটে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের মূল সত্তা। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধ মিশেছে বাংলাদেশের সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির অঙ্গনে। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, পত্রপত্রিকা, সাহিত্য মুক্তিযুদ্ধকে আবিষ্কার করেছে। বর্তমান পাঠে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে প্রবন্ধের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশেছিল মৃত্যু ভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব দেশ মাতৃকার বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযােদ্ধারা তাদের পরিবারকে স্মরণ করেছেন। প্রতিনিয়ত চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন তাঁদের আবেগের কথা। এ ধরনের চিঠির সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশনীর উদ্যোগে প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’ শীর্ষক বইতে। আবেগের অসাধারণ প্রকাশে এর প্রতিটি চিঠি হয়ে ওঠেছে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক দলিল, অসাধারণ এক একটি রচনা।
২. ‘একাত্তরের চিঠি’ প্রবন্ধ অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশপ্রেম এবং পারিবারিক মমত্ববােধের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা লিখুন।
‘একাত্তরের চিঠি’ মুক্তিযোদ্ধারা আবদুর রহিমের স্মৃতিচারণমূলক রচনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতীয় জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার যে বীজ রােপিত হয়েছিল, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার সফল পরিণতি ঘটে। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের মূলে প্রােথিত সত্তা, আমাদের অস্তিত্বের অংশবিশেষ।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংগীত-সংস্কৃতির মূল বিষয়-আশয়। মুক্তিযুদ্ধকে বারবার আবিষ্কার করা হয়েছে গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, কবিতায়, পত্রসাহিত্যে। বর্তমান পাঠে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে একটি বিশেষ আঙ্গিক-চিঠিপত্রের মাধ্যমে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশেছিল মৃত্যুভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব, দেশমাতৃকার প্রতি অপরিসীম ভালােবাসা এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রবল বাসনা। তবু আত্মীয়- স্বজনদের প্রতি তাঁদের মমতৃবােধ বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযােদ্ধারা তাদের পরিবারকে স্মরণ করেছেন। প্রতিনিয়ত চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন তাদের আবেগের কথা। একাত্তরের চিঠিতে মুক্তিযােদ্ধা মাে. আবদুর রহিম তাঁর মায়ের কাছে যুদ্ধের বিভীষিকার কথা বর্ণনা করছেন। তিনি তাঁর ছেলেবেলার কথা স্মরণ করে বলছেন, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যুদ্ধে যােগদান করেন। পঁচিশ সদস্যের একটি প্লাটুন নিয়ে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়, যার মাঝে তিনিও ছিলেন। তাঁরা জনৈক তােফায়েলউদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন আক্রমণের জন্য। কিন্তু তােফায়েল উদ্দিনের এক গৃহকর্মী পাকসেনাদের তাঁদের অবস্থানের কথা জানিয়ে আসে। পাকবাহিনী তাঁদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করে। আক্রমণে তােফায়েল উদ্দিনের শিশুপুত্র ছাড়া সবাই মারা পড়ে। বীর মুক্তিযােদ্ধা মাে. আবদুর রহিমের সহযােদ্ধারা শহীদ হন। তিনি আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তাঁর এক বন্ধু তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি তাঁর মাকে নিরাপত্তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে চিঠিটি সাবধানে পড়তে বলেছেন।
এ রচনাতে ১৯৭১ সালের বাঙ্গালিদের মধ্যে প্রবল দেশপ্রেম ও পারিবারিক স্নেহ মমতার এক বিচিত্র আখ্যানভাগ ফুটে উঠেছে। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালীন স্বজনপ্রীতি, দেশপ্রম মুখ্য হয়ে উঠেছে। দেশকে কতটা ভালোবাসলে একজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে যায় তা সত্যিই অবাক করার মতাে। যুদ্ধের সময়ে চোখের সামনে একটি বাড়ির সবাইকে মরতে দেখা এবং সেই বাড়ির চার মাসের বেঁচে যাওয়া শিশু সবই রহিমের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়এদেশের অসংখ্য যুবক, তরুণ ও লােকজন দেশমাতৃকার টানে স্ত্রী, কন্যা, পুত্র, ভাই-বােন, মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ্যে তাদের একটিই আর তা হলাে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকের অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে দেশকে মুক্ত করা। একাত্তরের চিঠি’ তে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে এক বিশেষ আঙ্গিকে চিঠিপত্রের মাধ্যমে। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে মিশে ছিল মৃত্যু ভয় অতিক্রমকারী বীরত্ব, দেশ মাতৃকার প্রতি অপরিসীম ভালােবাসা এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রবল বাসনা। তবুও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি তাদের মমতৃবােধ বিন্দুমাত্র কমে নি। স্বৈরাচারী পাক বাহিনীর দীর্ঘদিনের শাসন আর শােষণে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের মানুষকে পরাধীনতার গ্লানি মােচন করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দেবার জন্য মুক্তিযােদ্ধারা নিজ জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছিল এক অজানা পথে। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস এক রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বীর বাঙালি পাক সেনাদের পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করে। আমরা পেলাম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।
পরিশেষ়ে বলা যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশপ্রেম এবং পারিবারিক মমত্ববোধের চিত্র ‘একাত্তরের চিঠি’-তে ফুটে উঠেছে।
পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…
বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…
Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)
Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…
Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…
Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…
This website uses cookies.