এক্সপ্রেসিভ আর্ট (চারু ও কারুকলা)

ক্লাস-০৩: চারুকলার ব্যবহারিক উপাদান: অনুপাত ও পরিপ্রেক্ষিত এবং ছবি আঁকার উপকরণ

  • চারুকলার ব্যবহারিক উপাদানসমূহ কী কী উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দিন।
  • চিত্রকলায় অনুপাত ও পরিপ্রেক্ষিত কেন গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা করুন।
  • ছবি আঁকার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলির বর্ণনা দিন।

চারুকলার ব্যবহারিক উপাদানসমূহ কী কী?

চারুকলার ব্যবহারিক উপাদান

চারু ও কারুকলার ব্যবহারিক উপাদানগুলোই হচ্ছে অঙ্কনের মূল বিষয় বা হাতিয়ার। ব্যবহারিক বিষয়গুলোর কোন একটির অনুপস্থিতি ছবিকে অসম্পূর্ণ করে রাখে। ভাল একটি ছবি আঁকতে এর কোনটিকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। যার জন্য অঙ্কন শেখার পূর্বে এই ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে ধারণা থাকা একজন আঁকিয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঙ্কনের মাধ্যমে শিক্ষক ব্যবহারিক দিকগুলোর কলা-কৌশল আয়ত্ত করে ছবি অঙ্কনের সময় তা প্রয়োগ করবেন।

প্রশিক্ষক এবং শিক্ষককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে এ নিয়ম কেবল বড়দের জন্য, শিশুদের জন্য নয়।

চারু ও কারুকলার উল্লেখযোগ্য উপাদানসমূহ:

  • অনুপাত (Proportion)
  • সমতা (Symmetry)
  • পরিপ্রেক্ষিত (Perspective)
  • আলোছায়া (Light and Shade)
  • ভারসাম্য (Balance)
  • কেন্দ্রীয় আকর্ষণ (Central Interse)
  • গঠন বা রচনাশৈলী (Composition)

নিম্নে উপাদানসমূহের বিস্তারিত ধারণা ব্যাখ্যা করা হলো:

অনুপাত (PROPORTION)

অঙ্কনের জন্য অনুপাত একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। একই দৃশ্যপটে তুলনামূলকভাবে দেখা একটি জিনিস থেকে আর একটা জিনিস কত বড় বা কত ছোট, তাই অনুপাত। অনুপাতের সঠিক ব্যবহারের কোন বাস্তবধর্মী ছবিই সফল হতে পারে না। একটি দৃশ্যপটে যদি একটি হাতি এবং একটি ছাগল আঁকা হয়, তাহলে হাতি ছাগলের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কত বড় হবে অথবা ছাগলটি তুলনামুলকভাবে কত ছোট হবে সেটা অনুপাতের মাধ্যমে ঠিক করা হয়।

পরিপ্রেক্ষিত (PERSPECTIVE)

ভালমানের ছবি আঁকার জন্য পরিপ্রেক্ষিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে  বাস্তবধর্মী চিত্র অংকনে এটি দরকার হয়। অংকনের সময় কোন একটি বস্তু অপর একটি বস্তু থেকে কত দূরে অবস্থান করছে এবং বিভিন্ন বস্তু কোন দৃষ্টিকোণ হতে শিল্পী দেখেছেন, এই দুটি দেখানোই পরিপ্রেক্ষিত।

ছবিতে কোন বস্তুর দুরত্ব বুঝানোর ক্ষেত্রে কাছের বস্তুটির আকার বড় আর যতই দূরে দেখানো হবে বস্তুটি ঠিক ততই তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে যাবে এটাই পরিপ্রেক্ষিত। আকাশের প্রান্তরেখা নিচের দিকে আর জমিনের প্রান্তরেখা উপর দিকে যা সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালে দেখা যায়। আকাশ দূরে যেন পানির সাথে মিশে আছে যাকে আমরা দিগন্ত রেখা বলে থাকি।

আলো-ছায়া (Light and Shade)

বাস্তবধর্মী চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে আলোছায়ার গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণত সীমারেখা দিয়ে ছবি আঁকা হলেও তাকে বাস্তবধর্মী চিত্র বলা যাবে না। আলোছায়ার মাধ্যমে একটি বস্তুর সঠিক অবস্থান বুঝাতে আলোছায়ার ব্যবহার করা হয়। সাধারণত তিন রকমের আলো বা টোন ব্যবহার করা হয়। যেমন-

  • লাইট টোন,
  • মিডল টোন ও
  • ডার্ক টোন।

ভারসাম্য (Balance)

ছবির বিভিন্ন অংশের মধ্যে রেখা, রং ও বিষয়ের সমন্বয় থাকাকে ভারসাম্য বলা হয়। এর প্রধান দিক হলো রেখা ও রং-এর মাত্রা যেন সমপর্যায়ে থাকে। একটি চিত্রকে আকর্ষণীয় করার জন্য রং, রেখা ও বিষয়বস্তুর মধ্যে পারস্পারিক মিল রাখার জন্য ভারসাম্য জরুরি। ক্যানভাসের কোথাও ফাঁকা রাখা যাবে না।

কেন্দ্রিয় আকর্ষণ (Central Interse)

প্রত্যেকটি শিল্পকর্মের মধ্যে একটি জায়গা ফোকাস করা হয় যাতে মূল বিষয়বস্তুটি পূর্ণাঙ্গতা পায়। কেন্দ্রিয় আকর্ষণ একটি চিত্রকর্মের মূল আকর্ষণ যার মাধ্যমে দর্শকের চোখ পড়ে তথা মন ও আবেগকে নাড়া দেয়। আর মূল বিষয়বস্তকে ফুটিয়ে তোলার জন্য আরও কিছু ছোটখাটো বিষয়কে ব্যবহার করা হয়।

গঠন বা রচনাশৈলী (Composition)

প্রতিটি শিল্পকর্ম তৈরির পূর্বে একজন শিল্প একটি খসড়া তৈরি করেন। ছবিতে কোন কোন জিনিস থাকবে সেগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেই মূলত গঠন বা রচনা শৈলী বলা হয়। গঠন শৈলী যত পরিকল্পিত ও পরিপাটি হবে চিত্রের গুণগত মান বা নান্দনিকতা তত বৃদ্ধি পাবে।

ছবি আঁকার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলির বর্ণনা দিন।

চিত্রাংকনের জন্য যে সকল উপকরণ দরকার হয় তাকেই ছবি আঁকার উপকরণ বলা হয়। ছবি আঁকার নিমিত্তে ব্যবহার্য সকল প্রকার বস্তুকেই চিত্রাংকন সামগ্রী বা উপকরণ বলা যেতে পারে। চিত্রাংকনের তথা ছবি আঁকার জন্য বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যেমন- কাগজ, পেন্সিল, কলম, সাইনপেন, বিভিন্ন মাধ্যমের রঙ, তুলি, ক্যানভাস, ইরেজার, স্কেল, ইজেল, বোর্ড, ক্লীপ ইত্যাদি। নিম্নে এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উপকরণের বর্ণনা করা হলো:

পেন্সিল

সাধারণ লেখা এবং ড্রইং করার জন্য আমরা সচরাচর এক ধরনের পেন্সিল ব্যবহার করে থাকি। এ পেন্সিলের গায়ে লেখা থাকে ঐই, এসব পেন্সিলের শীষ তুলনামূলক একটু শক্ত এবং দাগ টানলে গাঢ় হয় না। ড্রইং করার জন্য নরম এবং শীষ মোটা পেন্সিল যেমন-২B, ৩B, ৪B এবং ৬B প্রয়োজন হয়। ২B, ৩B, ৪B এবং ৬B, এ চার মাত্রার যে কোন পেন্সিল দিয়ে পেন্সিল স্কেচ করা যায়।

কাগজ

ছবি আঁকার জন্য আমরা যে কোন কাগজ ব্যবহার করতে পারি। তবে মোটা সামান্য খসখসে কাগজ ছবি আঁকার জন্য উপযোগী। ছবি আঁকার মাধ্যম কালি, কলম, পেন্সিল, জল রং অথবা প্যাস্টেল রং এর উপর নির্ভর করে কাগজ বাছাই করে নিতে হয়। কালি কলমে আঁকার জন্য তুলনামূলকভাবে মসৃণ ও একটু মোটা কাগজ ভাল। পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে একটু মোটা সামান্য খসখসে কাগজ ব্যবহার করা হয় এবং একই ধরনের কাগজে জল রং ও প্যাস্টেল ব্যবহার করা যায়। তবে জল রং দিয়ে ছবি আঁকার জন্য হ্যান্ডমেড পেপার খুবই উপযোগী। ছবি আঁকার জন্য সাধারণ মানের একটি কাগজ পাওয়া যায় তা হলো কার্টিজ পেপার। এ ধরনের পেপারে প্রায় সব মাধ্যমে কাজ করা যায়।

এছাড়া আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের কাগজ পাওয়া যায় যেমন- আর্ট পেপার, আর্ট কার্ড, অফসেট পেপার, বক্সবোর্ড, পিসবোর্ড, নানা প্রকার পাতলা আর্ট কার্ড, বিভিন্ন রং এর পোস্টার পেপার, নিউজ প্রিন্ট ইত্যাদি। বক্স বোর্ডের এক পিঠ মসৃণ এবং এক পিঠ খসখসে ছাই বা বাদামী রং এর হয়। পিসবোর্ড শক্ত এবং মোটা। পিসবোর্ডে প্যাস্টেল রং দিয়ে ছবি আঁকা যায়। বক্সবোর্ড ছবি আঁকা ছাড়াও ছবি মাউন্ট করার বা বাঁধাই- এর কাজে ব্যবহার করা হয়।

কালি কলম

আমরা সাধারণত লেখার কাজে কলম ব্যবহার করি। কলম দিয়ে ছবিও আঁকা যায়। ঝরণা কলম দিয়েও ছবি আঁকা যায়। কোন কোন সময় রঙিন কালি ব্যবহার করে ছবি আঁকলে বেশ মজার ছবি আঁকা যায়। ছবি আঁকার জন্য সাধারণত চাইনিজ ইঙ্ক ব্যবহার করে ছবি আঁকলে ভাল হয়। বর্তমানে মার্কার পেন বা সিগনেচার পেন দিয়েও সাদা কালো ও রঙিন ছবি আঁকা চলছে। বাঁশের কঞ্চি এবং খাগের কঞ্চি দিয়ে কলম তৈরি করে (মোটা বা চিকন) মজার ছবি আঁকা যায়। চারকলও ছবি আঁকার একটি ভাল মাধ্যম।

রং ও তুলি

রং হলো ছবি আঁকার অন্যতম একটি মাধ্যম বা উপকরণ। রং বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে । যেমন- জল রং, পোস্টার রং, এক্রেলিক রং, ফেব্রিক রং, পেন্সিল রং, তেল রং ইত্যাদি। রং এর মাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় তুলিও ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের হয়ে থাকে। কালি ও জল রং এ ছবি আঁকার জন্য নরম পশম দিয়ে তৈরি করা তুলি ব্যবহার করা হয়। তেল রং এ ছবি আঁকার জন্য শক্ত পশম বা প্লাস্টিক এর তৈরি তুলি ব্যবহার করে থাকে। এটি সাধারণত শিল্পী কী ধরনের ছবি আঁকবে তার উপর নির্ভর করে। সরু থেকে ধীরে ধীরে মোটার দিকে আঁকার জন্য বিভিন্ন নম্বরের তুলি ব্যবহার করা হয়। ০ থেকে শুরু করে ২০ বা তদুর্ধ্ব নম্বরের তুলি থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুরা ১ থেকে ১২ নং পর্যন্ত তুলি ব্যবহার করে থাকে।

বোর্ড ও ক্লীপ

বোর্ড ও ক্লীপ ছবি আঁকার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। বোর্ডে কাগজ রেখে ক্লিপ দিয়ে আটকিয়ে ছবি আঁকলে সুবিধা হয়। বোর্ড মেঝেতে রেখে, কোলের উপর রেখে বা ইজেলে রেখে ছবি আঁকা যায়। বোর্ডের ব্যবহার নির্ভর করে আঁকিয়ের/ শিল্পীর বসার অবস্থানের উপর। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের রং এর প্যালেট, রাবার, জ্যামিতি বক্স, স্কেল, মডেলিং টুল্স, হাতুড়ি, বাটাল, র‌্যান্দা , করাত, তারকাটা ইত্যাদি ছবি আঁকা বা কারুকলার কাজে ব্যবহার করা হয়।

পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য প্রশ্ন

  • চারুকলার ব্যবহারিক উপাদানসমূহ কী কী?
  • চিত্রকলায় অনুপাত কাকে বলে?
  • চিত্রকলায় ভারসাম্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  • পরিপ্রেক্ষিত কী? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দিন।
  • আলো ও ছায়া কী?

proshikkhon

Share
Published by
proshikkhon

Recent Posts

বিটিপিটি শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি

পরিমার্জিত ডিপিএড (বিটিপিটি) উপমডিউল-৪.১: ‍শিল্পকলা বিটিপিটি সামষ্টিক মূল্যায়নঃ শিল্পকলা বিষয়ের গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন: বিস্তৃত…

2 years ago

পড়তে শেখা ও পড়ে শেখা

বাংলা : প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আলোচ্য বিষয়: পড়া/পঠন (Reading) বলতে কী বোঝায়?পড়ার অংশ কয়টি ও…

3 years ago

Acronyms list: Used in teaching and learning

Very important for teachers and educators. Acronyms list: Used in teaching and learning (more…)

3 years ago

শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম

Co-curricular activities in child development শিশুর বিকাশে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের ধারণা ও গুরুত্ব সহশিক্ষাক্রমিক…

3 years ago

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায়

Ways to develop teachers' professional skills পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উপায় প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম৷…

3 years ago

শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা

Individuality and intelligence of the child শিশুর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও বুদ্ধিমত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার ধরণ অনুযায়ী…

3 years ago

This website uses cookies.